পূর্ণাঙ্গ চালুর প্রায় এক সপ্তাহ পরই নতুন চালু হওয়া ‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’ বা নতুন ইয়ালু নদী সেতু দিয়ে চীনের সীমান্ত শহর ডান্দোংয়ে পৌঁছেছেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিকভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আল-জাজিরা’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার (২৪ অক্টোবর) এই সফর অনুষ্ঠিত হয়। চীন ও উত্তর কোরিয়াকে সংযোগকারী এই সেতুটি নির্মাণের দীর্ঘ ১২ বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর মাত্র এক সপ্তাহ পরই কিম জং উন এই সফর করলেন। এর মাধ্যমে এশিয়ার পরাশক্তি চীন এবং তার ছোট প্রতিবেশী পারমাণবিক শক্তিধর উত্তর কোরিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হলো। এছাড়া ১৯৫০-৫৩ সালের কোরিয়ান যুদ্ধে চীনের অংশগ্রহণের বার্ষিকীর ঠিক একদিন আগে এই সফর অনুষ্ঠিত হলো।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স দক্ষিণ কোরিয়ার একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, চীনের প্রিমিয়ার লি চিয়াং সীমান্ত শহর ডান্দোংয়ে কিম জং উনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তবে এ বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
রয়টার্স ও এএফপি সংবাদ সংস্থা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, কিম দুই দেশের সংযোগকারী নতুন ইয়ালু নদী সেতু দিয়ে ডান্দোংয়ে পৌঁছান। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ইয়নহাপ নিউজ এজেন্সি’ও একজন অজ্ঞাত সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে এই সফরের খবর প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কিমের এই সফর তার ক্রমবর্ধমান সরব ও দৃঢ় বৈদেশিক নীতিরই একটি অংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বেইজিং ও মস্কোকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট বা ‘নতুন স্নায়ুযুদ্ধ’-এর রূপরেখায় পিয়ংইয়ংয়ের অবস্থানকে আরও সুসংহত করার চেষ্টা করছেন তিনি।
সম্পর্ক জোরদার ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৩ কিলোমিটার (১ দশমিক ৯ মাইল) দীর্ঘ নতুন এই ইয়ালু নদী সেতুর উদ্বোধন দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক জোরদার করার একটি অন্যতম প্রধান প্রতীক এবং এটি তাদের বাণিজ্য সম্প্রসারণের ইচ্ছারই প্রতিফলন। আশা করা হচ্ছে যে, এই সেতু দিয়ে কন্টেইনারবাহী জাহাজ ও ভারী কার্গো ট্রাকসহ চব্বিশ ঘণ্টাই দুইমুখী যানবাহন চলাচল করতে পারবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চার লেনের এই অবকাঠামোটি ২০১৪ সালেই নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছিল, তবে উত্তর কোরিয়া অংশে সংযোগকারী রাস্তা এবং কাস্টমস বা শুল্ক সুবিধা না থাকায় এর উদ্বোধন দীর্ঘদিন বিলম্বিত হয়েছিল।
চীনের শেনিয়ামে অবস্থিত সরকারি থিঙ্কট্যাংক ‘লিয়ানিং একাডেমি অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস’-এর চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ লু চাও রয়টার্সকে বলেছেন, এই সেতুর উদ্বোধন চীন-উত্তর কোরিয়া বাণিজ্য লজিস্টিকসের একটি বড় বাধা দূর করেছে। তিনি আরও বলেন, লজিস্টিকস বা পরিবহন খাতের এই বাধা দূর হওয়ায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চীন হলো উত্তর কোরিয়ার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং এই গোপনীয় রাষ্ট্রটির জন্য কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তার এক অন্যতম প্রধান উৎস। যদিও দুই দেশের সম্পর্ক সবসময় একদম মসৃণ ছিল না। কোরিয়ান যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার পক্ষে লড়াই করা চীন পিয়ংইয়ংয়ের প্রধান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পৃষ্ঠপোষক। তবে ২০২২ সালে মস্কো ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন চালানোর পর থেকে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার আরও কাছাকাছি চলে গেছে, যা বিশ্লেষকদের মতে বেইজিংয়ের ওপর পিয়ংইয়ংয়ের নির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, কিম জং উনের সর্বশেষ চীন সফরটি হয়েছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। সে সময় বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ৮০তম বিজয় দিবস উদযাপনে যোগ দিতে চীন সফর করেছিলেন তিনি এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। এর আগে গত জুনে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উত্তর কোরিয়া রাষ্ট্রীয় সফর করেছিলেন। সে সময় তিনি বাণিজ্য, কৃষি, নির্মাণ ও প্রযুক্তিতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণে বেইজিংয়ের আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছিলেন। অন্যদিকে কিম জং উনের সঙ্গে চীনের সম্পর্ককে নিজেদের শীর্ষ কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।


