শত শত বছরের প্রাচীন অ্যালকেমি বা রসায়নশিল্পের রূপকথার মতো এবার পারদ থেকে স্থিতিশীল স্বর্ণ তৈরির দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান। ‘মারাথন ফিউশন’ নামের ওই প্রতিষ্ঠানটি পারমাণবিক ফিউশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই অসাধ্য সাধন করেছে বলে দাবি করেছে, যা গত বছর সার্নের গড়া রেকর্ডের চেয়ে দশ গুণ বেশি হারে স্বর্ণ উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক স্টার্টআপ ‘মারাথন ফিউশন’ গত ২১ অক্টোবর ঘোষণা করেছে যে, তারা ফিউশন-উৎপাদিত নিউট্রন ব্যবহার করে পারদকে সফলভাবে স্বর্ণতে রূপান্তর করেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির এই চাঞ্চল্যকর দাবির সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রক্রিয়াটি যেভাবে কাজ করে
মারাথন ফিউশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয় ‘নিউক্লিয়ার ট্রান্সমিউটেশন’ বা পারমাণবিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এটি এমন একটি কৌশল, যার সাহায্যে কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াস পরিবর্তন করে একটি মৌলকে অন্য মৌলে রূপান্তর করা যায়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা পারদ-১৯৮-কে ফিউশন বিক্রিয়ার সময় উৎপন্ন উচ্চ শক্তির নিউট্রনের সংস্পর্শে আনে। এর ফলে পারদ-১৯৭ নামক একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয় হয়ে স্থিতিশীল স্বর্ণ-১৯৭-এ পরিণত হয়।
সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার মতো নয়—যা কোনো মৌলের মূল পরিচয় পরিবর্তন করতে পারে না—পারমাণবিক বিক্রিয়াগুলো পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে পরিবর্তন করে এক মৌলকে অন্য মৌলে রূপান্তর করতে সক্ষম।
সার্নের রেকর্ডের সাথে তুলনা
এর আগে ২০২৫ সালে ইউরোপীয় পারমাণবিক গবেষণা সংস্থা সার্ন-এর গবেষকরা লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার-এ পরীক্ষার সময় সামান্য পরিমাণে স্বর্ণ উৎপাদনের কথা জানিয়েছিলেন। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে পরিচালিত ওই গবেষণায় আনুমানিক ২৯ পিকোগ্রাম স্বর্ণ উৎপাদিত হয়েছিল, যা অত্যন্ত নগণ্য পরিমাণ।
মারাথন ফিউশন দাবি করেছে যে, তাদের এই নতুন পদ্ধতিতে উৎপাদিত স্বর্ণের হার সার্নের সেই বেঞ্চমার্কের তুলনায় দশ গুণ বেশি। তবে কোম্পানিটি ঠিক কী পরিমাণ স্বর্ণ উৎপাদন করেছে, এর বিশুদ্ধতা কেমন, নিষ্কাশন দক্ষতা বা এই পুরো প্রক্রিয়ায় ঠিক কত খরচ পড়েছে সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। ফলে স্বাধীনভাবে এর মূল্যায়ন করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
কৃত্রিম স্বর্ণ কি স্বর্ণের বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে?
এই ঘোষণার পর কৃত্রিম উপায়ে তৈরি স্বর্ণ ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারের স্বর্ণের দামে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে কি না, তা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। মারাথন ফিউশন এর আগে অনুমান করেছিল যে, ভবিষ্যতের কোনো ফিউশন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে প্রায় দুই টন স্বর্ণ উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। তবে এই হিসাবটি সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক এবং এটি সম্পূর্ণভাবে বাণিজ্যিক ফিউশন চুল্লির সফল উন্নয়নের ওপর নির্ভর করছে।
ফিউশনের মাধ্যমে স্বর্ণ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি, বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন। তাছাড়া বাণিজ্যিক পরিসরে এর উৎপাদন এখনও প্রমাণিত নয়। স্বর্ণ উৎপাদন ছাড়াও এই স্টার্টআপটি ক্যানসার রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করছে।
যদিও এই দাবি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তবে এই পদ্ধতিটি বাস্তবে কেমন কাজ করে এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক উপায়ে বাণিজ্যিকভাবে স্বর্ণ উৎপাদনে সক্ষম কি না—তা নিশ্চিত করার জন্য স্বাধীন যাচাই-বাছাই এবং আরও প্রযুক্তিগত তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।


