যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কায় নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করছে ইরান। সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় দেশটির পরমাণু স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত করার পাশাপাশি যুদ্ধ শুরু হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন ইরানি কর্মকর্তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে ওয়াশিংটন। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি কমানো এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান।
যুদ্ধ আবার শুরু হলে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলো ইরানের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সতর্ক করেছে তেহরান। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান-সমর্থিত হুথিরা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি আরবে, বিশেষ করে রিয়াদ বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে, একাধিক হামলা চালিয়েছে। নতুন করে ইরানের হুঁশিয়ারি সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বাড়াতে পারে।
এদিকে ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই বলেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় থাকতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ডেটা সেন্টার ও ইন্টারনেট কেবলে হামলার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান জানিয়েছে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলার মাত্রা বাড়ানো হতে পারে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া এবং সেগুলোর নাবিক ও সেনাদের হত্যার চেষ্টার হুমকিও রয়েছে।
এ ধরনের হুমকি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত মাসে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ও নাতাঞ্জ পরমাণু স্থাপনায় নির্মাণকাজের আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছিল।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির বিশ্লেষণ এবং স্যাটেলাইট চিত্রের বরাতে বলা হয়েছে, এসব স্থাপনায় মাটির অস্থায়ী স্তূপ তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। সম্ভাব্য স্থল অভিযান মোকাবিলায় এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইরানের জরুরি পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলামরেজা জালালি সাংবাদিকদের জানান, সংকটের সময় কার্যক্রম সচল রাখতে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং বিকল্প সরবরাহ মজুতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য শুধু সামরিক অবকাঠামো নয়, সাধারণ মানুষকেও প্রস্তুত করার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের কিন্ডারগার্টেনে পাঠিয়ে শিশুদের যুদ্ধসংক্রান্ত গল্প শোনানো হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ আয়োজন এবং কাঁধে বহনযোগ্য বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণের বিজ্ঞাপনও দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য জনমত প্রস্তুত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকট থেকে মানুষের মনোযোগ সরানোর চেষ্টাও থাকতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের পরিচালক সানাম ভাকিল দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-কে বলেন, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক- সব ক্ষেত্রেই অচলাবস্থার মধ্যে যুদ্ধাবস্থা আপাতত ইরানের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। নতুন করে সংঘাত শুরু হলে দেশটির নেতৃত্ব বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রও। ওই অঞ্চলে তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপ এবং আরও একটি মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিট পাঠানো হচ্ছে।
গত সপ্তাহে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে অংশ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অথবা পরে যুদ্ধের অবসান হতে পারে। তবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেননি বলে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাতের সূচনা হয়। এর জবাবে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালায় তেহরান।
এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চেষ্টায় থাকা রিপাবলিকানদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, ইরান বিষয়ে ট্রাম্পের নীতির বিরোধিতা করেন প্রায় ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। বিরোধীদের মধ্যে প্রতি চারজন রিপাবলিকানের একজনও রয়েছেন।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি স্বল্পস্থায়ী অন্তর্বর্তী চুক্তি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তিচুক্তির কাঠামো তৈরি। তবে নতুন করে সামরিক তৎপরতা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে চুক্তিটি ভেঙে পড়ে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে এ অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।


