...|...|...

ধর্ম

দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য কী

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩:৫৯
Shares
দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য কী

ছবি: সংগৃহীত

দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মমতা ও মানসিক প্রশান্তি। ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে শুধু পারিবারিক বন্ধন হিসেবে দেখে না; বরং একে পরস্পরের নিরাপত্তা, সহযোগিতা ও দায়িত্ব পালনের সম্পর্ক হিসেবে তুলে ধরেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তার নিদর্শনাবলির মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য সঙ্গী-সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য।’ (সুরা রুম, আয়াত ২১)

কোরআনের অন্য আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা ও নির্ভরশীলতার বিষয়টি পোশাকের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৭) অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের সঙ্গী, সহায় ও মর্যাদা রক্ষার অংশীদার।

স্ত্রীর ভরণপোষণে স্বামীর দায়িত্ব

ইসলামে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর অর্পণ করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পুরুষেরা নারীদের প্রতি দায়িত্বশীল বা রক্ষক, যেহেতু আল্লাহ একের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং তারা তাদের সম্পদ থেকে ব্যয়ও করে।’ (সুরা নিসা, আয়াত ৩৪)

স্ত্রীর খাদ্য, পোশাক ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এসব প্রয়োজন পূরণে স্বামীর সামর্থ্য, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং প্রচলিত রীতিনীতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হয়। শুধু খাবারের উপকরণ বা কাপড় কিনে দেওয়াই যথেষ্ট কি না, কিংবা রান্না ও ঘরের কাজ কার দায়িত্ব-এসব বিষয়ে ইসলামী ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে এবং মাজহাবভেদে কিছু মতপার্থক্যও আছে।

স্ত্রীর জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা করাও স্বামীর কর্তব্য। সেখানে স্ত্রীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে বসবাসের কারণে স্ত্রীর ব্যক্তিগত পরিসর ও অধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়েও স্বামীকে সচেতন থাকতে হবে।

স্ত্রীর গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত মর্যাদা

দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর ব্যক্তিগত মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা জরুরি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমন বোঝাপড়া থাকা উচিত, যাতে উভয়েই নিজেদের নিরাপদ ও সম্মানিত মনে করেন। শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্য আত্মীয়দের সাথে বসবাসের ক্ষেত্রে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তা সমাধানে স্বামীর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।

স্ত্রীর ব্যক্তিগত পরিসর, পর্দা এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। পারিবারিক মতবিরোধের কারণে কাউকে অপমান করা, জোরজবরদস্তি করা কিংবা তার ন্যায্য অধিকার উপেক্ষা করা দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা ও পারিবারিক সহযোগিতা

স্বামীর মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সদাচরণ এবং তাদের প্রতি সম্মান দেখানো পারিবারিক সম্প্রীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবাকে স্ত্রীর ওপর বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ইসলামী ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর সামর্থ্য, সম্মতি, পারিবারিক পরিবেশ ও সংশ্লিষ্ট বিধান বিবেচনা করা প্রয়োজন।

স্ত্রী স্বেচ্ছায় শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করলে তা পারিবারিক সম্পর্ককে সুন্দর করতে পারে। তবে এ নিয়ে জোরজবরদস্তি বা অযথা চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। একইভাবে পর্দা ও শালীনতার বিধান মেনে পরিবারের সদস্যদের সাথে চলাফেরা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সংসারের উন্নতি ও সন্তানদের প্রতিপালনে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। স্বামী আর্থিক সংকটে পড়লে স্ত্রী নিজের ইচ্ছায় উপার্জন বা সংসারের কাজে সহযোগিতা করতে পারেন। তবে এ সহযোগিতাকে একতরফা দায়িত্ব না বানিয়ে দুজনের আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উত্তম।

স্ত্রীর দায়িত্ব ও স্বামীর প্রতি কর্তব্য

ইসলামে স্ত্রীর দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সংসারের কল্যাণে ভূমিকা রাখা, স্বামীর সম্পদের আমানত রক্ষা করা এবং দাম্পত্য সম্পর্কের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা। একই সাথে স্বামীর বৈধ নির্দেশের প্রতি আনুগত্যের বিষয়টিও ইসলামী শিক্ষায় গুরুত্ব পেয়েছে। তবে কোনো নির্দেশ অন্যায়, জুলুম বা আল্লাহর বিধানের পরিপন্থী হলে তা মানার বাধ্যবাধকতা নেই।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নারী যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, রমজান মাসে রোজা রাখে, নিজের সতীত্ব ও সম্ভ্রম রক্ষা করে শালীনতা বজায় রেখে চলে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তখন সে জান্নাতের যেকোনো দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে।’ (আবু দাউদ)

কোরআনেও সৎ নারীদের গুণাবলি তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘তবে সৎকর্মশীলা নারী বা সাধ্বী রমণীরা অনুগতা এবং লোকচক্ষুর অন্তরালেও তারা তা সংরক্ষণ করেন, যা আল্লাহ হেফাজত করেছেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত ৩৪)

সুখী দাম্পত্যের জন্য পারস্পরিক সম্মান জরুরি

দাম্পত্য জীবন সুন্দর রাখতে শুধু স্বামী বা স্ত্রীর দায়িত্ব পালনের ওপর নির্ভর করলেই হয় না; উভয়ের মধ্যে ভালোবাসা, ধৈর্য, সম্মান ও সহমর্মিতা থাকা প্রয়োজন। সংসারের কাজ, সন্তানদের লালন-পালন, আর্থিক পরিকল্পনা এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলে ভুল বোঝাবুঝি কমে।

ইসলামের শিক্ষা হলো, স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের অধিকার রক্ষা করবেন, দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবেন এবং একে অন্যের প্রতি সদয় আচরণ করবেন। অধিকার আদায়ের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের মানসিকতা থাকলেই দাম্পত্য জীবনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।