...|...|...

ধর্ম

সুস্থ থাকতে মহানবী (সা.)-এর যে ১৩টি সুন্নাহ মেনে চলতে পারেন

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১০:৪০
Shares
সুস্থ থাকতে মহানবী (সা.)-এর যে ১৩টি সুন্নাহ মেনে চলতে পারেন

ছবি: সংগৃহীত

ইসলামে সুস্থ জীবনযাপনের জন্য পরিচ্ছন্নতা, পরিমিত আহার, শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন ও ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এসব বিষয়ের সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত রয়েছে। খাবার গ্রহণ থেকে শুরু করে ঘুম, পানাহার ও অসুস্থতার সময় চিকিৎসা নেওয়া-জীবনের নানা ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামী আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহর একটি আলোচনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে জীবনযাপনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। সেই আলোচনার বিষয়বস্তুর আলোকে সুস্থ জীবনযাপনে প্রাসঙ্গিক ১৩টি অভ্যাস ও নির্দেশনা নিচে তুলে ধরা হলো।

১. মাদক ও ক্ষতিকর দ্রব্য থেকে দূরে থাকা

ইসলামে মাদক গ্রহণ নিষিদ্ধ। মাদকদ্রব্য মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই সুস্থ জীবনযাপনের জন্য মাদক পরিহার করা জরুরি। একইভাবে ক্ষতিকর ও নেশাজাতীয় দ্রব্য থেকে দূরে থাকাও স্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

২. হালাল ও পবিত্র খাবার গ্রহণ

পবিত্র কোরআনে হালাল ও পবিত্র খাদ্য গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলামী পরিভাষায় ‘হালালান তাইয়্যেবা’ বলতে বৈধ, পবিত্র ও উত্তম খাদ্য বোঝানো হয়। খাবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে বৈধতার পাশাপাশি পুষ্টিমান, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। সুষম খাদ্যাভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে।

৩. খাবারের আগে হাত পরিষ্কার করা

খাবার গ্রহণের আগে হাত ধোয়া পরিচ্ছন্নতার গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস। হাতের মাধ্যমে বিভিন্ন জীবাণু খাবারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো যায়। ইসলামী জীবনাচরণেও পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৪. পরিমিত খাবার খাওয়া

অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের পরিবর্তে পরিমিত আহার করার শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম। একটি হাদিসে মানুষের পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবার, এক-তৃতীয়াংশ পানীয় এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখার নির্দেশনা এসেছে। এ শিক্ষা খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং অতিভোজন এড়িয়ে চলার গুরুত্ব তুলে ধরে। পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী সুষম খাবার গ্রহণও সুস্থতার জন্য জরুরি।

৫. পানীয়ের পাত্রে নিঃশ্বাস না ফেলা

পানি পান করার সময় পাত্রের ভেতরে নিঃশ্বাস ফেলা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা হাদিসে রয়েছে। এ ধরনের অভ্যাস ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে সহায়ক। বিশেষ করে একাধিক ব্যক্তি একই পাত্র ব্যবহার করলে পানীয় দূষিত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

৬. খাবার বা পানীয়তে ফুঁ না দেওয়া

খাবার কিংবা পানীয় ঠান্ডা করার জন্য মুখ দিয়ে ফুঁ না দেওয়ার বিষয়ে ইসলামী নির্দেশনা রয়েছে। মুখের লালা বা ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে খাবারে জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা থাকতে পারে। তাই খাবার স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হতে দেওয়া এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ভালো অভ্যাস।

৭. বসে পানাহার করার অভ্যাস

বসে পানি পান করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাচরণের একটি পরিচিত দিক। এ বিষয়ে হাদিসে নির্দেশনা ও বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। তবে দাঁড়িয়ে পানি পান করলেই সবার শারীরিক ক্ষতি হয়-এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। স্বাভাবিকভাবে ও সতর্কতার সাথে পানি পান করাই গুরুত্বপূর্ণ।

৮. অতিরিক্ত গরম খাবার এড়িয়ে চলা

খুব গরম খাবার বা পানীয় গ্রহণ করলে মুখ ও খাদ্যনালিতে অস্বস্তি কিংবা পোড়ার মতো সমস্যা হতে পারে। তাই খাবার কিছুটা ঠান্ডা করে সহনীয় তাপমাত্রায় এলে খাওয়া ভালো। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত গরম পানীয় পান করার অভ্যাস খাদ্যনালির কিছু রোগের ঝুঁকির সাথে সম্পর্কিত বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।

৯. বড় পাত্রে মুখ লাগিয়ে পানি পান না করা

জগ, কলসি কিংবা বড় পাত্রের মুখে সরাসরি মুখ লাগিয়ে পানি পান না করার বিষয়ে হাদিসে নির্দেশনা পাওয়া যায়। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং অন্যদের ব্যবহারের জন্য পানি নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে এ অভ্যাস উপকারী হতে পারে। বিশেষত একাধিক ব্যক্তি একই পাত্রের পানি পান করলে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা প্রয়োজন।

১০. রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার বিষয়ে সচেতন থাকা

ইসলামে সুস্থতা রক্ষা এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাদিসে আজওয়া খেজুর, কালোজিরা ও মধুর বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ রয়েছে। এসব খাবার পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে, তবে এগুলো সব রোগের নিশ্চিত প্রতিষেধক নয়। কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা ভেষজ উপাদানকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকাদান, পরিচ্ছন্নতা, সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বিস্তর গবেষণা রয়েছে। তাই ধর্মীয় অনুশাসন পালনের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক পরামর্শ অনুসরণ করাও জরুরি।

১১. নফল রোজা পালনের অভ্যাস

রাসুলুল্লাহ (সা.) সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। এ ছাড়া প্রতি হিজরি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখার আমলও প্রচলিত। রোজা ইসলামে ইবাদত ও আত্মসংযমের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার গ্রহণের অভ্যাস কিছু মানুষের বিপাকীয় স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে উপবাস সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী নয়; বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

১২. রাতে সময়মতো ঘুমানো ও সকালে ওঠা

রাসুলুল্লাহ (সা.) এশার নামাজের আগে ঘুমানো এবং নামাজের পর অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তায় রাত কাটানো অপছন্দ করতেন বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস মানসিক সতেজতা এবং কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। দিনের বেলা প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প সময় বিশ্রাম নেওয়াও উপকারী হতে পারে।

১৩. নামাজে ধীরস্থিরতা বজায় রাখা

নামাজে রুকু, সেজদা ও অন্যান্য অবস্থান ধীরস্থিরভাবে আদায় করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। নামাজে একাগ্রতা ও স্থিরতা বজায় রাখা ইবাদতের অংশ। নামাজের কিছু শারীরিক ভঙ্গিতে শরীরের বিভিন্ন পেশি ও সন্ধি নড়াচড়া করে। তবে নামাজকে পূর্ণাঙ্গ শারীরিক ব্যায়ামের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়ামও করা উচিত।

সুস্থ জীবনে সুন্নাহর শিক্ষা

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শে পরিচ্ছন্নতা, সংযম, শৃঙ্খলা ও সুস্থ জীবনযাপনের নানা শিক্ষা রয়েছে। এসব শিক্ষা দৈনন্দিন জীবনে অনুসরণ করলে ব্যক্তিগত অভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। একই সাথে অসুস্থ হলে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার পাশাপাশি যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় বিশ্বাস ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্ভরযোগ্য নির্দেশনা সমন্বয় করে চললে সুস্থ জীবনযাপনের পথ আরও সুগম হতে পারে।