নামাজের সিজদা আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও দোয়া করার গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় নির্ধারিত তাসবিহ পাঠের পাশাপাশি বিভিন্ন দোয়া পড়ার বিষয়ে ইসলামী শরিয়তে কিছু বিধান রয়েছে। বিশেষ করে ফরজ ও নফল নামাজের সিজদায় কী ধরনের দোয়া করা যাবে, নিজের ভাষায় দোয়া করা যাবে কি না এবং সিজদায় কোরআন তিলাওয়াতের বিধান কী-এসব বিষয়ে মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, নামাজের সিজদায় দোয়া করার ক্ষেত্রে কোরআন-হাদিসের নির্দেশনা এবং মাজহাবভিত্তিক বিধান বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষত হানাফি মাজহাবে ফরজ ও নফল নামাজের মধ্যে কিছু বিধানগত পার্থক্য রয়েছে।
নামাজের সিজদায় ‘সুবহানা রব্বিয়াল আ‘লা’ পাঠ করা সুন্নত। পাশাপাশি হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন দোয়াও সিজদায় পড়ার কথা এসেছে। তবে কোন ধরনের দোয়া নামাজে পড়া যাবে, তা নিয়ে ফকিহদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
হানাফি মাজহাবের প্রচলিত ফতোয়া অনুযায়ী, নামাজে এমন দোয়া করা থেকে বিরত থাকতে হবে, যা মানুষের সাধারণ কথাবার্তার মতো অথবা মানুষের কাছেও চাওয়া সম্ভব। যেমন-আল্লাহর কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ, পোশাক, খাবার কিংবা কোনো ব্যক্তিকে বিয়ে করার ব্যবস্থা চাওয়া। এ ধরনের দোয়া নামাজের মধ্যে করলে নামাজ নষ্ট হওয়ার বিধান হতে পারে।
তবে কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়া নামাজে পড়ার অনুমতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ফরজ ও নফল নামাজের সিজদায় দোয়া পড়ার বিস্তারিত বিধান জানতে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সিজদায় নিম্নোক্ত দোয়া পড়তেন-
আল্লাহুম্মাগফিরলি জামবি কুল্লাহু, দিক্কাহু ওয়া জিল্লাহু, ওয়া আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমার সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন- ছোট-বড়, প্রথম ও শেষের সব গুনাহ।
দোয়াটি তাহাবি শরিফে বর্ণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সিজদায় এ ধরনের হাদিসে বর্ণিত দোয়া পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা যায়।
নামাজের ভেতরে বাংলা বা অন্য কোনো ভাষায় দোয়া করার বিধান নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে হানাফি মাজহাবে নামাজের মধ্যে মানুষের সাধারণ কথাবার্তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ দোয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা রয়েছে।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- নিশ্চয়ই নামাজ মানুষের কথাবার্তার উপযুক্ত স্থান নয়। এটি তাসবিহ, তাকবির ও কোরআন তিলাওয়াতের জন্য নির্ধারিত। —সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৩৭
হানাফি মাজহাবের ফিকহি গ্রন্থগুলোতে এ হাদিসের আলোকে নামাজে মানুষের সাধারণ কথার মতো দোয়া করার বিষয়ে বিধিনিষেধের আলোচনা রয়েছে। তবে দোয়ার ভাষা, বিষয়বস্তু এবং তা কোরআন-হাদিসে বর্ণিত কি না এসব বিবেচনায় বিধান ভিন্ন হতে পারে।
নামাজের বাইরে নিজের মাতৃভাষায় আল্লাহর কাছে যেকোনো বৈধ প্রয়োজনের কথা জানিয়ে দোয়া করা যায়। নামাজের বাইরে সিজদা করে দোয়া করার বিষয়েও আলেমদের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
নামাজে কোরআন তিলাওয়াতের নির্ধারিত স্থান হলো দাঁড়ানো অবস্থা বা কিয়াম। রুকু ও সিজদায় কোরআন তিলাওয়াত করতে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিষেধ করেছেন।
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে রুকু ও সিজদায় কোরআন পাঠ করতে নিষেধ করেছিলেন। —সহিহ মুসলিম
এ নিষেধাজ্ঞা ফরজ ও নফল উভয় নামাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই সিজদায় কোরআন তিলাওয়াত না করে নির্ধারিত তাসবিহ ও উপযুক্ত দোয়া পড়তে হবে।
নফল নামাজ আদায় করলে সওয়াব পাওয়া যায়, তবে তা আদায় না করলে সাধারণভাবে গুনাহ হয় না। তাহাজ্জুদের মতো নফল নামাজে আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও কল্যাণ প্রার্থনা করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
সিজদায় দোয়া করার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) উৎসাহ দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, বান্দা সিজদারত অবস্থায় তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী থাকে। তাই এ সময় বেশি বেশি দোয়া করার নির্দেশনা রয়েছে।
তবে দোয়া করার ক্ষেত্রে নামাজের নিয়ম ও ফিকহি বিধান অনুসরণ করা জরুরি। বিশেষ করে নামাজে বাংলা ভাষায় দোয়া, দুনিয়াবি প্রয়োজন চাওয়া এবং কোরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়ার বাইরে অন্য দোয়া পড়ার বিষয়ে মাজহাবভিত্তিক বিধান রয়েছে। নিজের অনুসৃত মাজহাব অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে বিষয়গুলো জেনে নেওয়াই উত্তম।

