একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেই যেন নিজের ফুটবল ক্যারিয়ারের দরজা বন্ধ করে ফেলেছেন মিলে সভিলার। বেলজিয়ামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই গোলকিপার এখন ইতালির ক্লাব রোমার অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর বেলজিয়ামের হয়ে খেলার সুযোগ নেই তার। সার্বিয়ার হয়ে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলায় ফিফার নিয়মে আটকে গেছে জাতীয় দল বদলের পথ। এখন সার্বিয়ার হয়েও খেলতে চান না তিনি, অথচ বেলজিয়ামে ফেরার দরজাও বন্ধ।
২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর হাঙ্গেরির দেব্রেচেনে কাতারের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিল সার্বিয়া। বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচে ৪-০ গোলে জেতে সার্বিয়া। বিরতির সময় প্রেদ্রাগ রাইকোভিচের বদলি হিসেবে মাঠে নামেন তখন ২২ বছর বয়সী সভিলার। সেটিই ছিল সার্বিয়ার জার্সিতে তার অভিষেক। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে ওই একটিই ম্যাচ খেলেছেন তিনি।
সভিলারের জন্ম ১৯৯৯ সালের আগস্টে বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পে। তার বাবা রাতকো সভিলার ছিলেন সাবেক যুগোস্লাভিয়ার গোলকিপার। বাবার পথ ধরেই ছোটবেলা থেকে ফুটবলে হাতেখড়ি। ১০ বছর বয়সে বেয়েরশট থেকে যোগ দেন আন্ডারলেখটে। পরে বেলজিয়ামের বয়সভিত্তিক বিভিন্ন দলে খেলেন। ২০১৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে আন্ডারলেখট ছেড়ে পর্তুগালের বেনফিকায় যোগ দেন। সেখানেই সিনিয়র ফুটবলে অভিষেক হয় তার।
বাবার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষার কথা বলতে গিয়ে উয়েফা ডটকমকে সভিলার বলেছিলেন, ‘বাবার কাছ থেকে অনেক শিখেছি, প্রায় সবকিছুই। আমার খেলার ধরনও বাবার মতো।’
বেলজিয়ামের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলার স্বপ্ন থাকলেও তখন গোলবারের নিচে ছিলেন থিবো কোর্তোয়া। ফলে জাতীয় দলে নিয়মিত সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা কম মনে করে ২০২১ সালে সার্বিয়াকে বেছে নেন সভিলার। কিন্তু সেখানে প্রেদ্রাগ রাইকোভিচ ও ভানিয়া মিলিঙ্কোভিচ-সাভিচের কারণে মূল একাদশে জায়গা পাননি। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের পরের চারটি ম্যাচের স্কোয়াডে থাকলেও মাঠে নামার সুযোগ হয়নি তার।
একপর্যায়ে সার্বিয়ার হয়ে আর খেলতে চাননি সভিলার। তার ইচ্ছা ছিল বেলজিয়ামে ফিরে যাওয়ার। কিন্তু ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, ফেডারেশন পরিবর্তনের পর নতুন দেশের সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামলে সাধারণত আগের দেশের হয়ে খেলার সুযোগ আর থাকে না। প্রস্তুতি ম্যাচ হলেও এই নিয়ম প্রযোজ্য। ফলে সার্বিয়ার হয়ে কাতারের বিপক্ষে খেলার পর বেলজিয়ামের হয়ে মাঠে নামার পথ বন্ধ হয়ে যায় তার।
২০২২ সালে বেনফিকা ছেড়ে ইতালিতে আসার পরও ফিফার কাছে ছাড় চেয়েছেন সভিলার। তবে কোনো সমাধান মেলেনি। ২০২৪ সালে বেলজিয়ামের তৎকালীন কোচ দোমেনিকো তেদেস্কো বলেছিলেন, ‘আমরা অবশ্যই কয়েক মাস ধরে তাকে অনুসরণ করছি। কিন্তু এটা পরিষ্কার, সে আমাদের হয়ে খেলতে পারবে না।’ তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, বেলজিয়ামও সভিলারকে দলে পাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করেছিল।
২০২৬ বিশ্বকাপের আগে আবারও ফিফার কাছে আবেদন করার চেষ্টা করেছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু এবারও হতাশ হতে হয়েছে তাকে। বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন কোর্তোয়া। ৭১ মিনিটে তার বদলে নামেন সেনে লামেন্স। পরে লামেন্সের ভুলের সুযোগ নিয়ে স্পেন ২-১ গোলে এগিয়ে যায়। ওই পরিস্থিতিতে সভিলার থাকলে কী হতো, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে সার্বিয়ার হয়ে খেলার সুযোগ এখনো রয়েছে তার। ২০২৫ সালে সার্বিয়ার কোচ ভেলিয়াকো পাউনোভিচও তাকে দলে ফেরানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। টিভি অ্যারেনা স্পোর্টকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ওর সাথে কথা বলেছি। ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দলের হয়ে আর খেলবে না। আমি দুঃখিত। আমি চেষ্টা করেছি ওকে দেখাতে যে সে গুরুত্বপূর্ণ, চাইলে জাতীয় দলে তার জায়গা আছে।’
তবু সার্বিয়ায় ফেরার বিষয়ে আগ্রহী নন সভিলার। অন্যদিকে বেলজিয়ামের হয়ে খেলার সুযোগও নেই। ফলে ক্লাব ফুটবলে সাফল্য পেলেও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে তার আক্ষেপ থেকেই যাচ্ছে। ২০২১ সালের সেই প্রস্তুতি ম্যাচটি তার কাছে তাই আর সাধারণ কোনো ম্যাচ নয় সেটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন এক সিদ্ধান্তের প্রতীক, যার পরিণতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ আজও খুঁজে পাননি তিনি।



