রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে অনেকেরই মনে হয়, প্রতিফলিত মুখটা যেন আর নিজের মতো নেই- কোথাও যেন বিকৃত হয়ে যাচ্ছে।
এই অভিজ্ঞতা নিয়েই গড়ে উঠেছে ‘ব্লাডি মেরি’র মতো লোককাহিনি, যেখানে অন্ধকার ঘরে আয়নার সামনে নাম উচ্চারণ করলে ভয়ংকর কিছু দেখা দেয় বলে বিশ্বাস করা হয়। কিন্তু এর পেছনে কোনো অতিপ্রাকৃত কারণ নেই- রয়েছে চোখ ও মস্তিষ্কের একেবারেই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া।
ট্রক্সলার ইফেক্ট: চোখের ‘ক্লান্তি’র খেলা
১৮০৪ সালে সুইস দার্শনিক ও চিকিৎসক ইগনাজ পল ভিটাল ট্রক্সলার লক্ষ করেন, কেউ যদি চোখের দৃষ্টি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে অল্প সময়ের জন্যও স্থির রাখেন, তাহলে তার প্রান্তিক দৃষ্টিতে থাকা স্থির বা অপরিবর্তনীয় ছবিগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুরু করে।
এই ঘটনা ঘটে কারণ চোখের স্নায়ুকোষগুলো গুরুত্বহীন উদ্দীপকের সাথে ধীরে ধীরে খাপ খাইয়ে নেয়- শুরুতে সবকিছু দেখা গেলেও পরে মস্তিষ্ক যা জরুরি নয় বা মূল দৃষ্টিকেন্দ্রের বাইরে, তা উপেক্ষা করতে থাকে। এই প্রক্রিয়াটিই পরিচিত ‘ট্রক্সলার ইফেক্ট’ বা ‘ট্রক্সলার ফেডিং’ নামে।
মূলত এটি স্নায়ুতন্ত্রের একধরনের সাশ্রয়ী কৌশল। পরিবর্তন বা নড়াচড়া শনাক্ত করার দিকেই মানুষের ইন্দ্রিয়-কোষগুলো সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল, কারণ বিবর্তনের দিক থেকে পরিবর্তন মানেই সম্ভাব্য বিপদ বা খাদ্যের ইঙ্গিত- তাই অপরিবর্তিত, স্থির কোনো তথ্যকে মস্তিষ্ক গুরুত্বহীন বলে ধরে নেয়।
এই ঘটনা শুধু আয়নাতেই ঘটে না- ছবির কোনো নির্দিষ্ট বিন্দু বা লেখার পাতার কোনো অংশে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে থাকলেও একই অভিজ্ঞতা হতে পারে।
‘স্ট্রেঞ্জ-ফেস ইলিউশন’: গবেষণা যা বলছে
আয়নার সাথে এই ইফেক্টের সম্পর্ক নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত গবেষণাটি করেন ইতালির উরবিনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী জিওভান্নি কাপুতো।
২০১০ সালে ‘পারসেপশন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত তার গবেষণায় ৫০ জন অংশগ্রহণকারীকে অল্প আলোযুক্ত ঘরে ১০ মিনিট ধরে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকতে বলা হয়েছিল।
ফলাফল ছিল চমকপ্রদ- ৬৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী নিজের মুখে বড় ধরনের বিকৃতি দেখতে পান, ১৮ শতাংশ দেখেন কোনো প্রাণী যেমন শূকর বা বিড়াল, ২৮ শতাংশ দেখেন অচেনা কোনো মুখ এবং ৪৮ শতাংশ দেখেন দানব বা কাল্পনিক কোনো অস্তিত্ব।
কাপুতোর মতে, শুধু পরিধিগত দৃষ্টির ‘ফিকে’ হয়ে যাওয়াই পুরো ব্যাখ্যা নয়। মুখ শনাক্তকরণে দক্ষ মস্তিষ্কের অংশটি যখন এই ফাঁকা তথ্য পায়, তখন তা নিজে থেকেই নতুন- কখনো কখনো ভয়ংকর- অবয়ব তৈরি করে সেই শূন্যস্থান পূরণ করার চেষ্টা করে।
এ কারণেই কেউ কেউ নিজের মুখে দেখতে পান পশুর অবয়ব, অচেনা মানুষ কিংবা প্রয়াত কোনো আত্মীয়ের ছায়া।
অন্য দৃষ্টিভ্রম থেকে আলাদা
ট্রক্সলার ইফেক্টকে মোশন-ইনডিউসড ব্লাইন্ডনেস বা বাইনোকুলার রাইভালরির মতো অন্য দৃষ্টিভ্রমের সাথে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। মোশন-ইনডিউসড ব্লাইন্ডনেসে বস্তু হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়, আর বাইনোকুলার রাইভালরিতে দুটি আলাদা ছবির মধ্যে একটি সাময়িকভাবে চোখে পড়ে না, কিন্তু কোনোটিতেই ট্রক্সলার ইফেক্টের মতো মুখ বা বস্তুর আকৃতি বদলে যায় না।
ভয় পাওয়ার কিছু নেই
এই দৃষ্টিভ্রম সম্পূর্ণ সাময়িক। চোখ সরিয়ে নিলে বা পলক ফেললেই দৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে যায়। তাই আয়নার সামনে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে যদি কখনো মুখ বিকৃত মনে হয়, তার পেছনে কোনো অতিপ্রাকৃত কারণ নেই- বরং এটি প্রমাণ করে, আমাদের মস্তিষ্ক বাস্তবতাকে হুবহু ‘রেকর্ড’ করে না, বরং প্রতিনিয়ত তা নিজের মতো করে গড়ে তোলে।



