...|...|...

লাইফস্টাইল

ডোপামিনের ‘রাশ’ কি ব্যথা কম অনুভব করায়?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৫৫
Shares
ডোপামিনের ‘রাশ’ কি ব্যথা কম অনুভব করায়?

ছবি: সংগৃহীত

খুব আনন্দের কোনো মুহূর্তে, বড় কোনো সাফল্যের পর কিংবা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে অনেক সময় শরীরের ক্লান্তি বা ব্যথা সাময়িকভাবে কম অনুভূত হতে পারে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে মস্তিষ্কে কি ‘ডোপামিন রাশ’ হওয়ার কারণে এমনটা হয়?

ডোপামিনকে আমরা প্রায়ই ‘হ্যাপিনেস হরমোন’ নামে চিনি। তবে এটি আসলে একটি নিউরোট্রান্সমিটার, যা মস্তিষ্কের reward, motivation, learning এবং movement-এর পাশাপাশি ব্যথা অনুভব ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ার সঙ্গেও যুক্ত।

তবে বিষয়টি ‘ডোপামিন বাড়লেই ব্যথা কমে যায়’ এমন না।

ব্যথা শুধু শরীরের সংকেত নয়

ব্যথা হলে শরীর থেকে সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছায়। কিন্তু সেই সংকেত মস্তিষ্ক কীভাবে গ্রহণ ও ব্যাখ্যা করবে, তা নির্ভর করে আরও অনেক বিষয়ের ওপর। মানসিক অবস্থা, মনোযোগ, প্রত্যাশা, আবেগ এবং পরিবেশ সবই ব্যথার অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

ডোপামিনার্জিক সিস্টেম এই pain-modulation বা ব্যথা নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ার একটি অংশ।

গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে ডোপামিনের কার্যক্রম ব্যথার অনুভূতি ও ব্যথা সহনশীলতার সাথে সম্পর্কিত। তবে ডোপামিনের কোন receptor সক্রিয় হচ্ছে এবং মস্তিষ্কের কোন অঞ্চলে তার কার্যক্রম ঘটছে তার ওপর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।

‘ডোপামিন রাশ’ মানেই painkiller নয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই বলা হয়, আনন্দ, ব্যায়াম, গান, সাফল্য বা পছন্দের খাবার থেকে ‘ডোপামিন রাশ’ হয় এবং এতে ব্যথা কমে যায়।

আসলে এমনটা সব সময় হবে তা নয়।

ডোপামিনের কার্যক্রম ব্যথা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু এটিকে সরাসরি painkiller হিসেবে বিবেচনা করার মতো প্রমাণ নেই। বরং reward system ও pain system-এর মধ্যে জটিল যোগাযোগের কারণে কোনো পরিস্থিতিতে ব্যথা কম অনুভূত হতে পারে।

অর্থাৎ ব্যথার অনুভূতি কমে যাওয়া আর শরীরের ক্ষত বা প্রদাহ সেরে যাওয়া দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

আনন্দে ব্যথা কম মনে হওয়ার কারণ কী?

ধরা যাক, কেউ খেলাধুলার সময় সামান্য আঘাত পেলেন। খেলা চলাকালে উত্তেজনা ও মনোযোগের কারণে তিনি হয়তো ব্যথাটি ততটা অনুভব করলেন না। খেলা শেষ হওয়ার পর ব্যথা বেশি মনে হতে পারে।

এখানে শুধু ডোপামিন নয়, শরীরের বিভিন্ন endogenous pain-modulation system, attention, stress response এবং অন্যান্য neurochemical mechanism ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যথা কম অনুভূত হওয়াকে শুধুমাত্র ‘ডোপামিন রাশ’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট নয়।

খাবারের সাথে ডোপামিনের সম্পর্ক

ডোপামিন তৈরির biochemical pathway-তে tyrosine নামের একটি amino acid গুরুত্বপূর্ণ precursor হিসেবে কাজ করে। খাদ্য থেকে protein গ্রহণের মাধ্যমে tyrosine পাওয়া যায়।

ডিম, মাছ, মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ডাল এবং সয়া এসব protein-rich খাবার খাদ্যতালিকায় tyrosine-এর উৎস হতে পারে।

তবে এখানেও একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা জরুরি।

কোনো নির্দিষ্ট খাবার খেলেই দ্রুত ডোপামিন বেড়ে গিয়ে ব্যথা কমে যাবে এমন দাবি করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

শরীরে neurotransmitter-এর উৎপাদন ও কার্যক্রম একটি জটিল biological process। শুধু একটি খাবার বা একটি পুষ্টি উপাদান দিয়ে মস্তিষ্কের dopamine system নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

‘Dopamine detox’ বা dopamine hacking কতটা বাস্তব?

ডোপামিন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘dopamine detox’, ‘dopamine hack’ কিংবা ‘dopamine-boosting food’ নিয়ে নানা দাবি দেখা যায়। কিন্তু এগুলোর অনেকটাই মিথ।

ডোপামিন এমন কোনো রাসায়নিক নয়, যাকে ইচ্ছেমতো ‘ডিটক্স’ বা ‘বুস্ট’ করে মস্তিষ্ককে পুনর্গঠন করা যায়। বরং নিয়মিত ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম, পর্যাপ্ত পুষ্টি, সামাজিক যোগাযোগ এবং স্বাস্থ্যকর দৈনন্দিন অভ্যাস মস্তিষ্ক ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কিপব্যায়ামের পর কেন ভালো লাগে?

নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের পর অনেকের মেজাজ ভালো হয় এবং মানসিক চাপ কমে। এ ক্ষেত্রে dopamine-এর পাশাপাশি endorphin, endocannabinoid এবং অন্যান্য neurochemical pathway ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই ব্যায়ামের পর পাওয়া ‘feel-good’ অনুভূতিকে শুধুমাত্র dopamine-এর ফল বলা ঠিক নয়।


মস্তিষ্কের neurotransmitter system ভালো রাখতে কোনো ‘ম্যাজিক ফুড’ প্রয়োজন নেই। বরং প্রয়োজন সামগ্রিকভাবে সুষম খাদ্যাভ্যাস।

খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত protein-এর পাশাপাশি শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং প্রয়োজনীয় micronutrients রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম ও নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ।

আর ব্যথা যদি তীব্র, দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার ফিরে আসে, তাহলে শুধু ‘dopamine rush’ বা কোনো খাবারের ওপর নির্ভর না করে কারণটি নির্ণয় করা জরুরি।


ডোপামিন আমাদের আনন্দ, প্রেরণা ও reward system-এর সঙ্গে যেমন যুক্ত, তেমনি ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জটিল প্রক্রিয়ার  সাথেও এর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে dopamine-related brain activity ব্যথার অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

ব্যথা কম অনুভূত হওয়া মানেই শরীরের সমস্যাটি চলে গেছে এমনটিও নয়। মস্তিষ্ক, আচরণ, আবেগ ও পুষ্টি সব মিলিয়েই আমাদের ব্যথার অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।

তাই dopamine rush-কে ‘প্রাকৃতিক painkiller’ না ভেবে, এটিকে মস্তিষ্কের জটিল pain-modulation system-এর একটি অংশ হিসেবে চিন্তা করাই উত্তম।

রাইসা মেহজাবীন
ফিটনেস পুষ্টিবিদ 
বি.এসসি (অনার্স), ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন, ডিইউ
এমপিএইচ (চলমান), পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
পিজিটি (Nutrition and Fitness Training), ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার
স্পেশালাইজড ইন  ফিটনেস নিউট্রিশন ট্রেনিং, নিউট্রিশন সলিউশনস
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও ফিটনেস কোচ, ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার, ধানমন্ডি ব্রাঞ্চ 
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ