কল্পনা করুন, আপনি একটা সাধারণ ছায়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। আপনার চোখে সেটা শুধুই ধূসর একটা ছায়া। কিন্তু ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন মানুষ সেই একই ছায়ার মধ্যে দেখছেন বেগুনি, নীলচে, সবুজাভ- অসংখ্য রঙের সূক্ষ্ম পরত। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, পৃথিবীতে সত্যিই এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের চোখ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি রং শনাক্ত করতে পারে।

চারুকলা শিক্ষক কনসেত্তা আন্তিকোর জীবনেও এমনই এক বিস্ময়কর মুহূর্ত এসেছিল। তিনি যেসব রঙের ছটা প্রতিদিন দেখতেন, তার ছাত্রছাত্রীরা সেগুলো একেবারেই দেখতে পেত না। তিনি ভেবেছিলেন, সবাই বুঝি তার মতোই দেখে- কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
পরবর্তীতে জিনগত পরীক্ষায় ধরা পড়ে, তার শরীরে এমন একটি জৈবিক বৈশিষ্ট্য আছে, যার নাম ‘টেট্রাক্রোমেসি’।
চোখের ভেতরের রহস্য: চতুর্থ ‘কোণ’ কোষ
মানুষের চোখে সাধারণত তিন ধরনের বিশেষ আলোক-সংবেদী কোষ থাকে, যাদের বলা হয় ‘কোণ’(cone)। এই তিনটি কোণ কোষ যথাক্রমে লাল, সবুজ ও নীল রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সাড়া দেয়। এই কোষগুলো থেকে আসা সংকেত মস্তিষ্কে মিলেমিশে তৈরি করে আমাদের দেখা প্রতিটি রং।
কিন্তু কিছু মানুষের চোখে থাকে একটি অতিরিক্ত, চতুর্থ ধরনের কোণ কোষ। তত্ত্বগতভাবে এর মানে হলো, তাদের মস্তিষ্ক আরও বেশি সংকেত পায়, ফলে দৃশ্যমান জগৎ তাদের কাছে হয়ে ওঠে আরও বর্ণিল, আরও সূক্ষ্ম।

লাল ও সবুজ রঙে সংবেদনশীল জিনগুলো থাকে ‘এক্স’ ক্রোমোজোমে। যেহেতু নারীদের দেহে দুটি এক্স ক্রোমোজোম থাকে, তাই মূলত জৈবিকভাবে নারীদের মধ্যেই এই বাড়তি ক্ষমতা দেখা যায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে একই জিনের ভিন্নতা বরং কিছু ক্ষেত্রে বর্ণান্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যুক্তরাজ্যের নিউকাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ নারীর দেহে এই জিনগত সম্ভাবনা থাকতে পারে- যদিও জনগোষ্ঠীভেদে এই হার ভিন্ন হতে পারে।
শুধু বাড়তি কোষ থাকলেই কি বাড়তি রং দেখা যায়
এখানেই আসল প্রশ্ন। শুধু চতুর্থ কোণ কোষ থাকা মানেই কেউ বাস্তবে বেশি রং দেখতে পাচ্ছেন, তা নিশ্চিত নয়। যদি সত্যিই কারও রং শনাক্ত করার ক্ষমতা বাস্তবে বেশি হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘ফাংশনাল টেট্রাক্রোমেসি’- কিন্তু এটি প্রমাণ করা মোটেও সহজ কাজ নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, চার ধরনের কোণ কোষবিশিষ্ট কিছু নারী রঙের সূক্ষ্ম পার্থক্য সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক স্পষ্টভাবে আলাদা করতে পারেন।
প্রাণিজগতেও এর সমান্তরাল উদাহরণ মেলে- কিছু বানরের প্রজাতিতে স্ত্রী বানরেরা (তিন কোণ কোষবিশিষ্ট) পুরুষ বানরদের (দুই কোণ কোষবিশিষ্ট) চেয়ে অনেক দ্রুত পাকা লাল ফল খুঁজে বের করতে পারে।
এই বাড়তি রং আসলে দেখতে কেমন
এটি বর্ণনা করাই সবচেয়ে কঠিন অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন সাধারণ মানুষের রং দেখার অভিজ্ঞতা পরিমাপ করাই কঠিন- সেখানে টেট্রাক্রোম্যাটদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা তো আরও দুরূহ। একে অনেকটা তুলনা করা যায় বর্ণান্ধ একজন মানুষের কাছে ‘লাল-সবুজ আসলে কেমন’ প্রশ্নের সাথে- যা ভাষায় প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব।

গবেষকদের ধারণা, টেট্রাক্রোম্যাসির ধরনও একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে, কারণ অতিরিক্ত কোণ কোষটি কতটা সংবেদনশীল, তার ওপর নির্ভর করে দেখার অভিজ্ঞতাও পাল্টে যায়।
কীভাবে বোঝা যাবে কেউ টেট্রাক্রোম্যাট কিনা
ইন্টারনেটে টেট্রাক্রোমেসি পরীক্ষার নানা অনলাইন টুল পাওয়া গেলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন এগুলো নির্ভরযোগ্য নয়। কারণ সাধারণ স্ক্রিনগুলোতে মাত্র তিনটি রঙের চ্যানেল (লাল-সবুজ-নীল) ব্যবহৃত হয়- তাই টেট্রাক্রোম্যাটরা যেসব বাড়তি রং বাস্তবে দেখেন, তা স্ক্রিনে প্রদর্শিতই হয় না।
কিছু সম্ভাব্য লক্ষণ অবশ্য আছে:
- ছোটবেলা থেকেই মনে হওয়া যে, নিজে অন্যদের চেয়ে আলাদাভাবে রং দেখছেন।
- উজ্জ্বল এলইডি বা ফ্লুরোসেন্ট আলোতে তীব্র অস্বস্তি বা অসুস্থ বোধ করা, উষ্ণ আলোয় স্বস্তি পাওয়া।
- বাবার মৃদু বর্ণান্ধতার ইতিহাস থাকা।
তবে বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, এসব কেবল ইঙ্গিতমাত্র- প্রকৃত নিশ্চয়তার জন্য দরকার জিনগত ও পরীক্ষাগার- ভিত্তিক পরীক্ষা।
রেটিনাল থেকে ফাংশনাল- এখনো এক রহস্য
চোখে বাড়তি কোণ কোষ থাকা (রেটিনাল টেট্রাক্রোমেসি) আর সেই ক্ষমতা বাস্তবে কাজে লাগানো (ফাংশনাল টেট্রাক্রোমেসি)- এই দুইয়ের মাঝের সংযোগ এখনো পুরোপুরি অজানা।
গবেষকদের প্রশ্ন- এর জন্য কি বিশেষ ধরনের কোণ কোষ দরকার, নাকি ব্যক্তি নিজে কীভাবে সেই সংকেত ব্যবহার করতে শেখেন, সেটাই আসল বিষয়?
চিত্রশিল্পী কনসেত্তা আন্তিকো মনে করেন, তার ক্ষেত্রে এটি অনেকটা ‘পেশী চর্চার’ মতো ব্যাপার। ছোটবেলা থেকে টানা ছবি আঁকা আর রং নিয়ে কাজ করার অভ্যাসই হয়তো তার এই ক্ষমতাকে শাণিত করেছে।

বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি
ফাংশনাল টেট্রাক্রোমেসি আদৌ বাস্তব কিনা, তা নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে এখনও মতভেদ আছে। এক গবেষকের ভাষায়, এটি এখনও ‘একটি দুঃসাহসিক দাবি’- যতক্ষণ না নিখুঁত কোনো পরীক্ষা এসে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করছে।
তবে এসব সংশয়ে দমে যাননি কনসেত্তা আন্তিকো। নিজের এই বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্যকে তিনি মনে করেন এক দুর্লভ সৌভাগ্য। তার ভাষায়- অন্যরা যা দেখতে পায় না, তা দেখতে পারাটা সত্যিই বিস্ময়কর, আর এটি তার জীবনকে করে তুলেছে আরও সুন্দর।

