...|...|...

অপরাধ

কে এই তাহসিফ সাউরি, যার মৃত্যু ঘিরে এত আলোচনা?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, রাত ৮:৫২
Shares
কে এই তাহসিফ সাউরি, যার মৃত্যু ঘিরে এত আলোচনা?

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। ছবি: সংগৃহীত

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাতে নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবার বলছে, তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন মেলেনি। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে তারা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও নিয়ে পুরোনো বিতর্কের সঙ্গে এই মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়।

নিখোঁজ হওয়ার আগের রাত

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সারা দিন তাহসিফ মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করেছেন। সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামে এক তরুণ নিচ থেকে ডাকলে তিনি মাকে বলে বেরিয়ে যান। উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে তিনি নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন। এরপর আর ফেরেননি। বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল জানান, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ মায়ের মোবাইলে বার্তা পাঠিয়ে জানান, তিনি আসছেন। সেটিই পরিবারের সঙ্গে তার শেষ যোগাযোগ।

গণমাধ্যমে দ্বীপ দাবি করেছেন, তিনি তাহসিফের মোটরসাইকেল মেরামতের জন্য একটি গ্যারেজে যান, এরপর উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খান। দুজন একসঙ্গে বাইকে ফেরার পথে উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকা পর্যন্ত একসঙ্গে ছিলেন এবং রাত আনুমানিক ১২টার দিকে আলাদা হয়ে যান। এরপর তাহসিফ কোথায় গেছেন, তা তিনি জানেন না বলে দাবি করেন। বাসা থেকে দুজনের একসঙ্গে বের হওয়ার দৃশ্য সিসিটিভিতে দেখা গেছে। 

মরদেহ উদ্ধার

বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর আসে, উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসছে। টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা মরদেহ উদ্ধার করেন। প্রথমে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে উদ্ধার করা হলেও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্রে পরে পরিচয় শনাক্ত হয়। মরদেহের পরনে ছিল কালো জামা ও সাদা পায়জামা, হাতে ঘড়ি।

সুরতহালের পর মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়া ও পেট ফোলা থাকার কথা উল্লেখ আছে। ঢাকা অঞ্চলের নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো জখম পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রয়োজন। বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। উত্তরায় জানাজা শেষে সন্ধ্যায় ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

পরিবারের অভিযোগ ও অমীমাংসিত প্রশ্ন

বাবা অভিযোগ করেছেন, তাহসিফকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মরদেহ যে এলাকায় পাওয়া গেছে, সেখানে তার ছেলে কখনো যাননি। বুধবার দুপুরে তিনি ছেলেকে খুঁজতে তুরাগ থানায় গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে আশ্বস্ত করা হয়। সোয়া ৫টার দিকে উত্তরখান থানার ওসি ফোন করে মরদেহ উদ্ধারের খবর দেন। হেলাল জানান, ছেলে কোনো হুমকির কথা বলেননি, তবে কিছুটা আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। রাত দেড়টা পর্যন্ত তাহসিফ কোথায় ছিলেন, শেষ বার্তা কে পাঠিয়েছিল এবং কোন বিষয়ে তিনি আতঙ্কিত ছিলেন, এসব প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে। 

শেষ বার্তা নিয়েও সংশয় আছে। বাবার ভাষ্য, বার্তায় ছেলেকে ব্যস্ত মনে হয়েছিল। তাহসিফের এক নিকটাত্মীয় বলেছেন, মায়ের মোবাইলে পাঠানো ভয়েস মেসেজটি তার কাছে তাহসিফের কণ্ঠ বলে মনে হয়নি। তাহসিফের মোটরসাইকেলটির এখনো সন্ধান মেলেনি। পুলিশ এটিসহ পুরো বিষয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছে। 

সরকার ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৃহস্পতিবার বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার আগে তিনি এ বিষয়ে কথা বলবেন না। ৫ আগস্টের ভিডিওর সঙ্গে মৃত্যুর যোগসূত্র আছে কি না, এ প্রশ্নেও তিনি তদন্তের আগে মন্তব্য করেননি। জামায়াতে ইসলামী এই মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছে। 

৫ আগস্টের ভিডিও নিয়ে কী বিতর্ক?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। ওই দিনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাহসিফের নাম এ প্রসঙ্গে এসেছিল। তবে ভিডিও ধারণ করা এবং ছড়িয়ে দেওয়া এক বিষয় নয়।

মৃত্যুর আগে ইউটিউবের ‘স্পিক উইথ রশীদ’ অনুষ্ঠানে তাহসিফকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এ কারণে তার চাকরি গিয়েছিল কি না। জবাবে তিনি বলেন, এমন হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ কোথায়, সে প্রশ্ন তোলেন এবং জানান, কিছু বিষয় তিনি প্রকাশ করতে পারবেন না। তার এই বক্তব্য ভিডিও ধারণ বা প্রচারের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করে না।

বৃহস্পতিবার আলজাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, বিমানবাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাতে তিনি জেনেছেন, ভিডিওটি তাহসিফ ধারণ করেননি। বিমানবাহিনী বা সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এ বিষয়ে পাওয়া যায়নি। ভিডিওটি আসলে কে ধারণ করেছিলেন এবং কীভাবে তা ছড়ায়, সে প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

বিমানবাহিনী থেকে কেন অবসর নিয়েছিলেন?

তাহসিফের বিমানবাহিনী ছাড়ার বিষয়টি নিয়েও আগে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০২৫ সালের আগস্টে একটি সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের পর তাকে এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফীকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল।

এর জবাবে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) একটি বিবৃতি দেয়। এতে বলা হয়, দুই কর্মকর্তাকে বিমানবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় অবসর দেওয়া হয়েছে। তাদের অবসরের সাথে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের কোনো সম্পর্ক নেই বলেও জানায় আইএসপিআর।

তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিমও সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তার ছেলের চাকরি ছাড়ার কারণ হিসেবে বিমানবাহিনী থেকে শৃঙ্খলাজনিত বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, তাহসিফ পডকাস্টে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ৫ আগস্টের ভিডিও নিয়ে তৈরি হওয়া অভিযোগ তার চাকরি ছাড়ার কারণ হয়ে থাকতে পারে। তবে তার এ বক্তব্য ছিল অনুমাননির্ভর; তিনি এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।

সামরিক পাইলট থেকে বেসামরিক জীবন

১৯৯৮ সালে জন্ম নেওয়া তাহসিফ সাউরির বয়স হয়েছিল ২৮ বছর। তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল। পরিবার নিয়ে তিনি উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে বসবাস করতেন।

পরিচিতজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাহসিফ ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হিসেবে সামরিক পাইলটের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

বিমানবাহিনী ছাড়ার পর তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং নেত্র নিউজে কাজ করেছিলেন বলে তার বাবা জানিয়েছেন। অর্থাৎ, সামরিক পেশা থেকে বেরিয়ে আসার পর তিনি বেসামরিক কর্মজীবনেও যুক্ত ছিলেন।

তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পরিচিতিতে ‘Veteran Military Pilot | Strategist | Entrepreneur’ লেখা ছিল। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন শেয়ার করে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনাও করেছিলেন তিনি।