...|...|...

স্বাস্থ্য

আর্থ্রাইটিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস: পার্থক্য কী?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:২৭
Shares
আর্থ্রাইটিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস: পার্থক্য কী?

ছবি: সংগৃহীত

জয়েন্টে ব্যথা হলেই কি বাত? বয়স বাড়লে হাঁটুতে ব্যথা আর অল্প বয়সে হাতের আঙুল ফুলে যাওয়া দুটিই কি একই রোগের লক্ষণ? আসলে আর্থ্রাইটিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এক নয়। সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক এদের পার্থক্য, লক্ষণ ও চিকিৎসা।

সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় হাঁটুতে ব্যথা, সকালে ঘুম থেকে উঠে আঙুল শক্ত হয়ে থাকা কিংবা হাতের গিঁট ফুলে যাওয়া এ ধরনের সমস্যায় অনেকেই বলেন, ‘বাত হয়েছে’। কিন্তু বাত বলতে আসলে কোন রোগকে বোঝানো হচ্ছে, তা অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে আর্থ্রাইটিস বলতে জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধির বিভিন্ন রোগকে বোঝায়। এর মধ্যে অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস দুটি পরিচিত ধরন। রোগ দুটির লক্ষণ কিছুটা একই রকম হলেও কারণ, শরীরে প্রভাব এবং চিকিৎসায় রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

তাই জয়েন্টে ব্যথা হলেই ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে ব্যথার ধরন বুঝে সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

আর্থ্রাইটিস কী?
সহজভাবে বললে, আর্থ্রাইটিস হলো জয়েন্টের রোগের একটি সাধারণ নাম। আমাদের হাঁটু, কাঁধ, কনুই, কবজি, আঙুল ও নিতম্বের মতো জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা বা শক্তভাব তৈরি হতে পারে বিভিন্ন কারণে।

অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও গাউট সবই আর্থ্রাইটিসের বিভিন্ন ধরন। তবে সব ধরনের আর্থ্রাইটিসের কারণ এক নয়। কোনো ক্ষেত্রে জয়েন্টের তরুণাস্থি ও অন্যান্য টিস্যুতে পরিবর্তন ঘটে, আবার কোনো ক্ষেত্রে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজের জয়েন্টে আক্রমণ করে।

অর্থাৎ, আর্থ্রাইটিস একটি বড় শ্রেণির নাম; অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস তার দুটি আলাদা রোগ।

অস্টিওআর্থ্রাইটিস কী?
অস্টিওআর্থ্রাইটিসে জয়েন্টের তরুণাস্থি ও আশপাশের টিস্যুতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটে। তরুণাস্থি হলো হাড়ের প্রান্তে থাকা মসৃণ আবরণ, যা নড়াচড়ার সময় হাড়ের মধ্যে ঘর্ষণ কমাতে সাহায্য করে।

এই টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে জয়েন্টে ব্যথা, শক্তভাব ও নড়াচড়ায় অসুবিধা হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে এ রোগের ঝুঁকি বাড়ে। তবে শুধু বয়সের কারণেই যে অস্টিওআর্থ্রাইটিস হবে, তা নয়। অতিরিক্ত ওজন, পুরোনো জয়েন্টের আঘাত এবং জয়েন্টের ওপর দীর্ঘদিন অতিরিক্ত চাপ পড়লেও ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অস্টিওআর্থ্রাইটিসের সাধারণ লক্ষণ:

  • হাঁটা বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় হাঁটুতে ব্যথা।
  • হাতের আঙুল, নিতম্ব বা অন্য জয়েন্টে ব্যথা।
  • বিশ্রামের পর জয়েন্ট শক্ত হয়ে থাকা, তবে সাধারণত তা অল্প সময় স্থায়ী হয়।
  • জয়েন্ট নড়াচড়া করতে অসুবিধা হওয়া।
  • কখনো জয়েন্টে খসখসে শব্দ বা ঘষা লাগার অনুভূতি হওয়া।
  • এ রোগে সাধারণত হাঁটু, নিতম্ব, হাতের আঙুল ও মেরুদণ্ড বেশি আক্রান্ত হয়। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো ব্যথা
  • কমানো, চলাফেরা সহজ করা এবং জয়েন্টের কার্যক্ষমতা ধরে রাখা।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস কী?

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি অটোইমিউন রোগ। অর্থাৎ, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে নিজের শরীরের সুস্থ টিস্যুকে আক্রমণ করে। এ রোগে জয়েন্টের ভেতরের আবরণে প্রদাহ তৈরি হয়।

এতে ব্যথা, ফোলা ও শক্তভাব দেখা দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে জয়েন্টের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। অস্টিওআর্থ্রাইটিসের মতো এটি শুধু বয়সজনিত সমস্যা নয়; তুলনামূলক কম বয়সেও হতে পারে।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের সাধারণ লক্ষণ:

  • হাত ও পায়ের ছোট ছোট জয়েন্টে ব্যথা ও ফোলা।
  • সকালে ঘুম থেকে উঠে জয়েন্ট শক্ত হয়ে থাকা, যা প্রায়ই ৩০ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়।
  • শরীরের দুই পাশে একই ধরনের জয়েন্টে সমস্যা দেখা দেওয়া।
  • দীর্ঘদিন ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভব করা।
  • কখনো সামান্য জ্বর বা শরীর খারাপ লাগা।
  • রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে সাধারণত হাতের আঙুল, কবজি ও পায়ের ছোট জয়েন্ট আক্রান্ত হয়। তবে এটি
  • শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শুধু ব্যথার ওষুধ খেয়ে উপসর্গ চাপা না দিয়ে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বে কত মানুষ আক্রান্ত?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ছিলেন। একই বছরে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ১ কোটি ৮০ লাখ।

এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, দুটি রোগই বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসমস্যা। তবে এগুলো ২০১৯ সালের হিসাব; বর্তমান বছরের রোগীর সংখ্যা হিসেবে এগুলোকে দেখার সুযোগ নেই।

সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-অস্টিওআর্থ্রাইটিস এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বিষয়ে NIAMS।

কীভাবে বুঝবেন কোন রোগ হয়েছে?

শুধু উপসর্গ দেখে অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মধ্যে পার্থক্য করা সব সময় সম্ভব নয়। এ জন্য চিকিৎসক প্রথমে রোগীর ব্যথার ইতিহাস জানেন এবং আক্রান্ত জয়েন্ট পরীক্ষা করেন।

প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি পরীক্ষা করা হতে পারে:

রক্ত পরীক্ষা: প্রদাহের মাত্রা এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু অ্যান্টিবডি যাচাই করতে।

এক্স-রে: জয়েন্টের গঠন ও ক্ষয়জনিত পরিবর্তন দেখতে।

আল্ট্রাসনোগ্রাম বা এমআরআই: প্রয়োজন হলে জয়েন্টের প্রদাহ ও অন্যান্য পরিবর্তন বুঝতে।

সব রোগীর সব পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। আবার কোনো একটি পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে সব সময় রোগ নিশ্চিত করা যায় না। উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফল মিলিয়ে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

চিকিৎসা কি একই রকম?

না। রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা আলাদা।

অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে নিয়মিত উপযুক্ত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ফিজিওথেরাপি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যথা কমানোর ওষুধ ব্যবহার করা হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে অন্য চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে ব্যথা কমানোর পাশাপাশি রোগের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এ জন্য চিকিৎসক রোগের তীব্রতা অনুযায়ী বিশেষ ওষুধ দিতে পারেন, যা রোগের অগ্রগতি ধীর করতে ও জয়েন্টের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে।

এ কারণে নিজের ইচ্ছায় শুধু ব্যথানাশক খাওয়া কিংবা অন্য কারও ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়। বিশেষ করে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের সন্দেহ হলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

জয়েন্টে ব্যথা কয়েক দিন ধরে থাকলে, বারবার ফিরে এলে কিংবা দৈনন্দিন কাজে বাধা সৃষ্টি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সকালে দীর্ঘ সময় জয়েন্ট শক্ত থাকা, একাধিক জয়েন্ট ফুলে যাওয়া বা হাতের আঙুলের গিঁটে নিয়মিত ব্যথা হলেও অবহেলা করবেন না।

আর কোনো জয়েন্ট হঠাৎ খুব ব্যথা করলে, ফুলে গেলে, গরম হয়ে গেলে এবং এর সঙ্গে জ্বর বা কাঁপুনি থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। কারণ জয়েন্টে সংক্রমণ হলে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

আর্থ্রাইটিস হলো জয়েন্টের বিভিন্ন রোগের সাধারণ নাম। অস্টিওআর্থ্রাইটিসে জয়েন্টের তরুণাস্থি ও অন্যান্য টিস্যুতে পরিবর্তন ঘটে, আর রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা জয়েন্টে প্রদাহ সৃষ্টি করে। তাই রোগ দুটির লক্ষণ কিছুটা মিললেও চিকিৎসা এক নয়।

জয়েন্টে ব্যথা মানেই ভয় পাওয়ার কারণ নেই। তবে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, ফোলা বা সকালের শক্তভাবকে অবহেলা করাও ঠিক নয়। সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, জয়েন্টের কার্যক্ষমতা বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।