...|...|...

স্বাস্থ্য

বাতের রোগীর ব্যায়াম: কী করবেন, কী এড়িয়ে চলবেন

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১০:০৮ | আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১০:৩২
Shares
বাতের রোগীর ব্যায়াম: কী করবেন, কী এড়িয়ে চলবেন

ছবি: সংগৃহীত

জয়েন্টে ব্যথা বলে ব্যায়াম বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়। বরং সঠিক ব্যায়াম ব্যথা কমাতে, পেশি শক্তিশালী করতে ও চলাফেরা সহজ করতে সাহায্য করতে পারে। তবে রোগের ধরন, ব্যথার তীব্রতা ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী বেছে নিতে হবে ব্যায়াম।

হাঁটুতে ব্যথা, হাতের আঙুল শক্ত হয়ে থাকা কিংবা সকালে ঘুম থেকে উঠে জয়েন্ট নাড়াতে কষ্ট বাতের রোগীদের কাছে এসব পরিচিত সমস্যা। ব্যথা বাড়ার ভয়ে অনেকেই হাঁটাচলা কমিয়ে দেন, ব্যায়াম বন্ধ করে দেন কিংবা দিনের বেশির ভাগ সময় বসে বা শুয়ে থাকেন।

কিন্তু এতে কি সত্যিই উপকার হয়?

চিকিৎসাবিষয়ক বিভিন্ন নির্দেশনা বলছে, সব ক্ষেত্রে বিশ্রামই সমাধান নয়। বরং উপযুক্ত শারীরিক কার্যক্রম জয়েন্টের ব্যথা কমাতে, পেশির শক্তি বাড়াতে এবং দৈনন্দিন কাজ সহজ করতে সাহায্য করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) বলছে, আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা ব্যথা কমানো, শারীরিক কার্যক্ষমতা বাড়ানো এবং মেজাজ ভালো রাখতে সহায়ক।

তবে সব ব্যায়াম সবার জন্য উপযুক্ত নয়। তাই বাতের রোগীর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোন ব্যায়াম করবেন, কতক্ষণ করবেন এবং কোন পরিস্থিতিতে ব্যায়াম বন্ধ রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন, তা জানা।

কেন বাতের রোগীদের ব্যায়াম প্রয়োজন?
বাতের কারণে জয়েন্টে ব্যথা ও শক্তভাব তৈরি হলে চলাফেরা কমে যেতে পারে। দীর্ঘদিন কম নড়াচড়া করলে পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে, শরীরের ভারসাম্য কমতে পারে এবং দৈনন্দিন কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

নিয়মিত উপযুক্ত ব্যায়াম এসব সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। ব্যায়ামের মাধ্যমে জয়েন্টের চারপাশের পেশি শক্তিশালী হয়, নড়াচড়ার সক্ষমতা বাড়ে এবং শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার এক্সিলেন্সের (NICE) অস্টিওআর্থ্রাইটিসবিষয়ক নির্দেশনায় ব্যায়ামকে চিকিৎসার অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে জয়েন্টের উপযোগী পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম এবং সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যায়ামের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শুরুতে কিছুটা ব্যথা বা অস্বস্তি হলেও নিয়মিত ব্যায়াম দীর্ঘ মেয়াদে উপকার দিতে পারে।

সূত্র: NICE—Osteoarthritis: diagnosis and management।

কোন ব্যায়ামগুলো করতে পারেন?

১. হাঁটা
হাঁটা সহজ ও পরিচিত ব্যায়াম। এটি শরীর সচল রাখতে, হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং দৈনন্দিন চলাফেরার সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

তবে হাঁটু বা নিতম্বে ব্যথা থাকলে শুরুতেই দীর্ঘক্ষণ হাঁটার চেষ্টা করবেন না। প্রথমে সমতল জায়গায় অল্প সময় হাঁটুন। শরীরের সঙ্গে মানিয়ে গেলে ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে পারেন। প্রয়োজনে আরামদায়ক জুতা ব্যবহার করুন এবং ব্যথা বাড়লে বিরতি নিন।

২. সাঁতার ও পানিতে ব্যায়াম
হাঁটু, নিতম্ব বা গোড়ালিতে ব্যথা থাকলে পানিতে ব্যায়াম অনেকের জন্য আরামদায়ক হতে পারে। পানির ভাসমান শক্তি শরীরের ওজনজনিত চাপ কিছুটা কমায়। ফলে জয়েন্টে তুলনামূলক কম চাপ নিয়ে নড়াচড়া করা যায়।

সাঁতার জানা না থাকলেও প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পানিতে হাঁটা বা সহজ কিছু ব্যায়াম করা যেতে পারে। তবে সাঁতারের ধরন ও ব্যায়ামের মাত্রা নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ঠিক করতে হবে।

৩. জয়েন্ট সচল রাখার ব্যায়াম
জয়েন্টের নমনীয়তা বজায় রাখতে ধীরে ধীরে হাত-পা ভাঁজ করা, সোজা করা কিংবা কাঁধ ঘোরানোর মতো সহজ নড়াচড়া উপকারী হতে পারে।

যেমন, চেয়ারে বসে ধীরে হাঁটু সোজা করা এবং আবার ভাঁজ করা যায়। হাতের আঙুল শক্ত হয়ে থাকলে ব্যথা না বাড়িয়ে ধীরে আঙুল ভাঁজ ও সোজা করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

তবে কোন জয়েন্টে কী ধরনের ব্যায়াম উপযুক্ত, তা রোগীর অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত। জয়েন্টে তীব্র ব্যথা বা ফোলা থাকলে জোর করে নড়াচড়া করবেন না।

৪. পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম
জয়েন্টের চারপাশের পেশি শক্তিশালী হলে শরীরের ভার বহন ও নড়াচড়ায় সুবিধা হতে পারে। এ জন্য হালকা প্রতিরোধমূলক ব্যায়াম, রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড কিংবা নিজের শরীরের ওজন ব্যবহার করে কিছু ব্যায়াম করা যায়।

হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসে উরুর পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম উপকারী হতে পারে। তবে ভারী ওজন তোলা বা বেশি চাপ দিয়ে ব্যায়াম শুরু করা উচিত নয়। প্রয়োজনে ফিজিওথেরাপিস্টের সাহায্যে সঠিক কৌশল শিখে নিতে হবে।

৫. হালকা স্ট্রেচিং ও ভারসাম্যের ব্যায়াম
স্ট্রেচিং বা পেশি টানটান করে ধরে রাখার ব্যায়াম শরীরের নমনীয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। আবার বয়স্কদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত ভারসাম্যের ব্যায়াম পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোর প্রচেষ্টায় সহায়ক হতে পারে।

তবে ব্যথাযুক্ত জয়েন্টে জোর করে টান দেওয়া কিংবা শরীরকে অস্বাভাবিকভাবে বাঁকানো ঠিক নয়। ব্যায়ামের সময় স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিন এবং ধীরে ধীরে নড়াচড়া করুন।

সূত্র: সিডিসি-Physical Activity and Arthritis, আমেরিকান কলেজ অব রিউমাটোলজি-Finding the Right Exercise Plan।

সপ্তাহে কতক্ষণ ব্যায়াম করবেন?
সিডিসির নির্দেশনা অনুযায়ী, সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম এবং অন্তত দুই দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করার লক্ষ্য রাখা উচিত। আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী এ লক্ষ্যের দিকে এগোতে পারেন।

তবে এই সময়সীমা সবার জন্য শুরুতেই প্রযোজ্য নয়। যারা দীর্ঘদিন ব্যায়াম করেননি, তাদের পাঁচ থেকে ১০ মিনিটের ছোট সেশন দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। একবারে দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করতে না পারলে দিনের বিভিন্ন সময়ে ভাগ করে নেওয়াও সম্ভব।

উদাহরণ হিসেবে, শুরুতে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ১০ মিনিট স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটা যেতে পারে। ব্যথা না বাড়লে ধীরে ধীরে সময় বাড়ানো যাবে। পরে চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম যোগ করা যেতে পারে।

মনে রাখতে হবে, ১৫০ মিনিট একটি সাধারণ স্বাস্থ্যলক্ষ্য প্রত্যেক বাতের রোগীকে প্রথম দিন থেকেই এই সময় পূরণ করতে হবে, এমন নয়।

সূত্র: সিডিসি-About Physical Activity and Arthritis।

ব্যায়ামের সময় কী এড়িয়ে চলবেন?
বাতের রোগীর জন্য ব্যায়ামের পাশাপাশি কিছু সতর্কতা মেনে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।

  • ব্যথা উপেক্ষা করে ব্যায়াম করবেন না: ব্যায়ামের শুরুতে সামান্য অস্বস্তি হতে পারে। তবে ব্যথা তীব্র হলে, ক্রমাগত বাড়লে বা ব্যায়ামের পরও না কমলে ব্যায়াম বন্ধ রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
  • হঠাৎ কঠিন ব্যায়াম শুরু করবেন না: দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর দৌড়ানো, ভারী ওজন তোলা কিংবা কঠিন ব্যায়াম শুরু করলে জয়েন্ট ও পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। ধীরে ধীরে ব্যায়ামের মাত্রা বাড়াতে হবে।
  • জয়েন্টে অতিরিক্ত চাপ দেবেন না: হাঁটুতে ব্যথা থাকলে লাফানো বা বারবার গভীরভাবে হাঁটু ভাঁজ করার মতো ব্যায়াম উপসর্গ বাড়াতে পারে। কোন ব্যায়াম এড়িয়ে চলবেন, তা নির্ভর করবে রোগের ধরন ও ব্যথার অবস্থানের ওপর।
  • তীব্র প্রদাহের সময় জোর করবেন না: জয়েন্ট হঠাৎ ফুলে গেলে, গরম হয়ে গেলে বা ব্যথা অনেক বেড়ে গেলে জোরে ব্যায়াম না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। তবে কত দিন সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে, তা চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
  • অন্যের ব্যায়াম অনুকরণ করবেন না: একজনের জন্য উপযোগী ব্যায়াম অন্যজনের জন্য নিরাপদ নাও হতে পারে। বিশেষ করে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, গুরুতর অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা অন্য শারীরিক সমস্যা থাকলে ব্যক্তিভিত্তিক পরিকল্পনা জরুরি।

সিডিসির পরামর্শ হলো, ধীরে শুরু করতে হবে এবং শরীরের প্রতিক্রিয়া খেয়াল করতে হবে। নতুন ব্যায়ামের পর ব্যথা, শক্তভাব বা ফোলা দেখা দিলে তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে; উপসর্গ গুরুতর হলে স্বাস্থ্যসেবাদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে কি একই ব্যায়াম?
দুই রোগের চিকিৎসায় ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিকল্পনা এক রকম নাও হতে পারে।

  • অস্টিওআর্থ্রাইটিসে হাঁটু, নিতম্ব বা হাতের জয়েন্টের কার্যক্ষমতা বজায় রাখা এবং আশপাশের পেশি শক্তিশালী করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। হাঁটা, সাইক্লিং, পানিতে ব্যায়াম ও নির্দিষ্ট পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম উপকারী হতে পারে।
  • রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে জয়েন্টে প্রদাহের মাত্রা, আক্রান্ত জয়েন্ট এবং রোগের সক্রিয়তা বিবেচনায় নিতে হয়। রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকলে নিয়মিত ব্যায়াম উপকারী হতে পারে। তবে তীব্র প্রদাহের সময় আক্রান্ত জয়েন্টে চাপ কমিয়ে ব্যায়ামের ধরন পরিবর্তন করা প্রয়োজন হতে পারে।

আমেরিকান কলেজ অব রিউমাটোলজির রোগীবিষয়ক তথ্যেও বলা হয়েছে, ব্যায়াম বেছে নেওয়ার সময় এর ধরন, তীব্রতা, সময়কাল এবং রোগীর সক্ষমতা বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে ফিজিওথেরাপিস্ট বা অকুপেশনাল থেরাপিস্টের সাহায্যে ব্যায়ামের পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

সূত্র: American College of Rheumatology।

কখন ব্যায়াম বন্ধ রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
ব্যায়ামের সময় বা পরে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে সতর্ক হোন:

  • জয়েন্টে হঠাৎ তীব্র ব্যথা বা উল্লেখযোগ্য ফোলা।
  • জয়েন্ট লাল ও গরম হয়ে যাওয়া।
  • ব্যথার সঙ্গে জ্বর বা কাঁপুনি।
  • কোনো অঙ্গের ওপর ভর দিতে বা জয়েন্ট নাড়াতে না পারা।
  • নতুন করে অসাড়তা বা পেশির দুর্বলতা দেখা দেওয়া।
  • বিশেষ করে জয়েন্টে হঠাৎ তীব্র ব্যথা, ফোলা ও গরম অনুভূতির সঙ্গে জ্বর থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। কারণ জয়েন্টে সংক্রমণসহ গুরুতর সমস্যার লক্ষণ এমন হতে পারে।

বাতের রোগীর জন্য ব্যায়াম কোনো বিলাসিতা নয়। সঠিকভাবে করলে এটি চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিয়মিত হাঁটা, পানিতে ব্যায়াম, জয়েন্ট সচল রাখার নড়াচড়া এবং পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম ব্যথা কমাতে ও দৈনন্দিন কাজ সহজ করতে সাহায্য করতে পারে।

তবে ব্যায়াম মানেই বেশি কষ্ট করা নয়। অল্প সময় দিয়ে শুরু করা, ধীরে ধীরে মাত্রা বাড়ানো এবং ব্যথার পরিবর্তন খেয়াল করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রোগের ধরন ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নিয়ে ব্যায়ামের পরিকল্পনা করলে উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।