শিক্ষক সংকট, মানহীন শিক্ষা কার্যক্রম ও একের পর এক খারাপ ফলাফলে মুখ থুবড়ে পড়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সন্তানদের জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটিতে এখন নিজস্ব শিক্ষার্থীদেরই আগ্রহ নেই। ফলে লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে বহিরাগত শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির পেছনে প্রতিবছর ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
অথচ প্রতিবছর বিভিন্ন সরকারি পরীক্ষার ফলাফলে ধস নেমে এসেছে। ফলে বিষয়টিকে ভস্মে ঘি ঢালার সাথে তুলনা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা। এছাড়া শিক্ষক-সুবিধা ছাড়াই কলেজ শাখা চালু, দক্ষ শিক্ষক সংকট এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনাকে এ সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ল্যাবরেটরি স্কুলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক অ্যাডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির দৈন্যদশা শুরু হয়েছে। বর্তমানে স্কুল পর্যায়ে ৫৫০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত থাকার কথা থাকলেও রয়েছে ২৫০ জন। এর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে আছে ৫০ জন। এছাড়া কলেজ পর্যায়ে ১৫০ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা থাকলেও কোনো শিক্ষার্থী নেই। ফলে নানা সংকট ও ফলাফলে ধসের কারণে গত কয়েক বছর ধরে কলেজে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না।
সম্প্রতি ৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা বাজেটে নির্মিত নতুন ভবনের অনেক কক্ষই খালি পড়ে আছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হলেও পড়ছেন বহিরাগতরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ২০০ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সন্তানদের মাত্র ৭-১০% এতে পড়ছেন বলে জানা গেছে। শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১০ জন। এতে প্রতিষ্ঠানটি চালানো যাচ্ছে না বলে বরারবই অভিযোগ করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির পেছনে প্রতিবছর ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। বছরপ্রতি আরো ৫% করে বৃদ্ধি পায়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১ কোটি এবং ইউজিসি থেকে ২০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এ পরিমাণ টাকা খরচ করলেও দিনশেষে বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল ধস নেমে আসছে।
সর্বশেষ এ বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৫০ জন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছেন মাত্র ২২ জন। এর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে মাত্র ৩ জন। এছাড়া বিগত চার বছরেও শতভাগ পাস করার রেকর্ড নেই। ২০২৪ সালের উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষায় ১৪ জন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছে মাত্র ৩ জন। ২০২৫ সালের পরীক্ষার তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া এ বছর ৬ জন পরীক্ষা দিয়েছেন।
এদিকে এমন দুর্দশার মধ্যে ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে কলেজ পর্যায়ের কোনো শিক্ষক ছাড়াই কলেজ শাখা চালু করা হয়। যা প্রতিষ্ঠানটির সংকটকে আরো দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। স্কুল পর্যায়ের শিক্ষকরাই পরিচালনা করছে কলেজের শ্রেণি কার্যক্রম। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪১৭ জন শিক্ষক, ৪৮৬ জন কর্মকর্তা ও ২৯০ জন কর্মচারী রয়েছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক বাসা ফাঁকা বেশি হওয়ায় তাদের অধিকাংশই ক্যাম্পাসের বাইরে বসবাস করেন। ফলে বেশিরভাগ আবাসিক বাসা ফাঁকা পড়ে আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের একটি প্রতিষ্ঠানের এমন দুরবস্থার পেছনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফিলতি ও প্রতিষ্ঠানটির অদক্ষ শিক্ষকরাই দায়ি। বিগত প্রশাসনগুলো যোগ্যতা ছাড়াই তাদের পছন্দসই লোকদেরই এখানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এতে প্রতি বছরই পরীক্ষার ফলাফলের এমন দুরবস্থা দেখা যাচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে অনেক শিক্ষক কর্মকর্তা ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে ক্যাম্পাসের বাইরে পড়ান।
এমনকি বাইরের শিক্ষার্থীরাও এখানে ভর্তি হতে চায় না। আবাসিক বাসাগুলোর অনেকগুলোই নিম্নমানের ও জরাজীর্ণ। এর বিপরীতে বাসাভাড়া তুলনামূলক বেশি। এসব কারণেই তারা আবাসিক বাসায় থাকতে আগ্রহী নন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বলেন, স্কুলটি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সন্তানদের জন্য করা হয়েছিল। এখন উল্টো প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি এখন বন্ধ করেও দেওয়া যাচ্ছে না আবার সঠিকভাবে চালানোও যাচ্ছে না। এর পেছনে যে টাকা ব্যয় হয় আর যা ফল আসে তাতে পানিতে টাকা ফেলা বললেও ভুল হবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জালাল উদ্দীন বলেন, স্কুলটির অবস্থা খুবই হতাশাজনক। এখানকার শিক্ষকদের দক্ষতা ও যোগ্যতার ঘাটতিই এর মূল কারণ। যদি মেধার প্রশ্ন ওঠে, তাহলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাচ্চাদের কেন গড়ে তোলা যাচ্ছে না? ভ্যানচালকের ছেলে কি মেধাবী হতে পারে না? দুরবস্থা কারণেই শিক্ষক-কর্মকর্তারাও তাদের সন্তানদের এখানে পড়ান না।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মোজাম্মেল হক বলেন, উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষক ও অন্য সুবিধা ছাড়াই তৎকালীন প্রশাসন কলেজ শাখা চালু করেছে। তখন থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের দিয়ে কলেজ শাখা পরিচালনা করলেও গত দুই বছর আগে শিক্ষক সংকটে তা বন্ধ করতে বাধ্য হই। এখানে ২০১০ সালে পরে কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তাছাড়া শিক্ষক-কর্মকর্তারা তাদের সন্তানদের এখানে ভর্তি করান না। তাই শিক্ষার্থীও পাওয়া যাচ্ছে না। আর শিক্ষকদের অভিযোগগুলোর ভিত্তি নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইইআরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষকের পাশাপাশি একজন দক্ষ প্রধান শিক্ষক প্রয়োজন। শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে আমাদের পূর্ববর্তী প্রশাসনের সাথে আলোচনা হয়েছিল এবং এ বিষয়ে কার্যক্রমও শুরু হয়েছিল। তবে নতুন প্রশাসনের এ বিষয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমরা আবারো আলোচনায় বসবো।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমানের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তার কার্যালয়ে গিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ব্যস্ত রয়েছেন বলে জানান।


