পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি, মেঘের আনাগোনা আর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির টানে আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পাহাড়কন্যা বান্দরবান। দুর্গাপূজার টানা ছুটির রেশ কাটতে না কাটতেই এবার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে। উৎসবের আমেজে পাহাড়ের বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে চলছে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। অন্যদিকে ফানুস ওড়ানোর বর্ণিল আয়োজন দেখতে মুখিয়ে আছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা।
সদ্য শেষ হওয়া দুর্গাপূজার ছুটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটক বান্দরবানে ঘুরতে আসেন। অনেকে সাজেকে ভ্রমণের পরিকল্পনা পরিবর্তন করেও এ জেলায় এসেছেন। ছুটির শেষ দিনে অনেক পর্যটক ফিরতে শুরু করলেও প্রবারণা পূর্ণিমাকে ঘিরে নতুন করে ভ্রমণপ্রত্যাশীদের আগমন বাড়ছে। ফলে পর্যটনকেন্দ্র, হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে ব্যস্ততা অব্যাহত রয়েছে।
বান্দরবানের পর্যটন আকর্ষণের অন্যতম দিক হলো এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বহু জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনধারা। নীলাচল, মেঘলা, নীলগিরি, শৈলপ্রপাতসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি পর্যটকেরা উপভোগ করছেন পাহাড়ি জনপদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। স্থানীয় বাজারে পাহাড়ে উৎপাদিত ফলমূল, শাকসবজি ও বিভিন্ন হস্তশিল্পের পণ্যও আকর্ষণ করছে ভ্রমণকারীদের।
প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ একটি ধর্মীয় উৎসব। তিন মাসের বর্ষাবাস শেষে এই তিথিতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বিশেষ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেন। সংঘদান, অষ্টপরিষ্কার দান ও বুদ্ধপ্রতিবিম্ব দানের পাশাপাশি বিভিন্ন বিহারে চলে প্রার্থনা ও পুণ্যকর্ম। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ফানুস ওড়ানো। সন্ধ্যার আকাশে শত শত ফানুসের আলো পাহাড়ি জনপদকে ভিন্ন এক সৌন্দর্যে সাজিয়ে তোলে।
প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপন পরিষদের সদস্য সনুমং মারমা বলেন, প্রবারণার সময় পাহাড়জুড়ে ফানুস ওড়ানোর দৃশ্য দেখতে অনেক মানুষ সমবেত হন। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে সম্প্রীতি, শান্তি ও সৌহার্দ্যের বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান তারা। মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই প্রধান উৎসব হলেও প্রবারণা তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি উৎসবটি পর্যটকদের কাছেও বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পর্যটকদের ভ্রমণ নির্বিঘ্ন করতে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পর্যটকেরা যাতে অতিরিক্ত ভাড়া কিংবা থাকা-খাওয়ার খরচ নিয়ে ভোগান্তিতে না পড়েন, সে বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।
বান্দরবান সদরসহ জেলার সাত উপজেলায় তিন শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে প্রায় ২৫ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতিতে হোটেল-রিসোর্টের পাশাপাশি পরিবহন, খাবারের দোকান ও স্থানীয় পণ্য বিক্রির সাথে যুক্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
বান্দরবান হোটেল-মোটেল মালিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন জানান, এবারের ছুটিতে পর্যটকদের ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে সেবার মান বজায় রাখার চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সরকারি রাজস্ব আয়ও বাড়ে।
এদিকে জেলার পর্যটন খাতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে। বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তায় জেলা পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। যাতে ভ্রমণকারীরা নিরাপদে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ধর্মীয় আয়োজন ও পাহাড়ি সংস্কৃতির মেলবন্ধনে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে বান্দরবান। দুর্গাপূজার ছুটিতে আসা পর্যটকদের একাংশ ফিরে গেলেও প্রবারণা পূর্ণিমাকে ঘিরে নতুন করে পর্যটকদের আগমনে মুখর হয়ে উঠছে পাহাড়ের পর্যটনকেন্দ্রগুলো। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ফানুসের আলোকচ্ছটায় পাহাড়কন্যা বান্দরবান এখন পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠেছে আরও আকর্ষণীয়।


