টানা বৃষ্টি, পাহাড়ধস ও উজানের ঢলে গত জুলাইয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১০ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। চার দশকের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় চট্টগ্রামে। অতিবৃষ্টিতে তলিয়ে যায় নগরের বিভিন্ন এলাকা। একই সময়ে তীব্র জলাবদ্ধতার মুখে পড়ে রাজধানী ঢাকাও। এর আগে এপ্রিল-মে মাসে বজ্রপাত এবং জুনে তাপপ্রবাহ মানুষের জীবন ও জনজীবনে উদ্বেগ তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় অগ্রগতির ফলে প্রাণহানি কমানোর সাফল্য থাকলেও নতুন ধরনের দুর্যোগে ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে বজ্রপাত, পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি ও তাপপ্রবাহ এখন বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ ১৩ অক্টোবর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ঘর থেকে শুরু করি, দুর্যোগসহনশীল দেশ গড়ি’। দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আগাম সতর্কবার্তা জোরদার এবং পরিবার ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে দিবসটিতে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৮৯ সালে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো এবং এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেয়। পরে ২০০৯ সালে সিদ্ধান্ত হয়, প্রতিবছর ১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালন করা হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে বিভিন্ন দুর্যোগে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। একই সময়ে দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৫৩৩ জন। ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে সবচেয়ে বড় অংশ বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের।
মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ বছরে বন্যায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২৯ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ ১১ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডে ২ হাজার ২০ কোটি টাকা, ভূমিকম্পে ১০৮ কোটি টাকা এবং বজ্রপাতে ১০৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এসব খাতের আর্থিক ক্ষতির যোগফল মন্ত্রণালয়ের উল্লেখ করা মোট ক্ষতির সঙ্গে মিলে যায়।
তবে প্রাণহানির চিত্রে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের চেয়ে বজ্রপাতের প্রভাব বেশি। মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে ১ হাজার ৫৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে অগ্নিকাণ্ডে ৬৫৪ জন, বন্যায় ১৯৭ জন, পাহাড়ধসে ৯০ জন, ঘূর্ণিঝড়ে ৫২ জন এবং ভূমিকম্পে ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ বছরে বিভিন্ন দুর্যোগে নিহতদের প্রায় ৬০ শতাংশই বজ্রপাতে মারা গেছেন।
বছরভিত্তিক হিসাবেও বিভিন্ন দুর্যোগে উল্লেখযোগ্য প্রাণহানির তথ্য রয়েছে। ২০২১ সালে ৬০৩ জন, ২০২২ সালে ৫৯১ জন, ২০২৩ সালে ৫০৯ জন, ২০২৪ সালে ৫৩৯ জন এবং ২০২৫ সালে ৩৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই পাঁচ বছরের সংখ্যা যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ২ হাজার ৬৪০ জন, যা মন্ত্রণালয়ের উল্লেখ করা মোট ২ হাজার ৫৩৩ জনের চেয়ে ১০৭ জন বেশি। ফলে মোট প্রাণহানির সংখ্যা ও বছরভিত্তিক হিসাবের এই অমিল মূল সরকারি তথ্যের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে প্রতিবছর আনুমানিক ৩৩ লাখ ৬০ হাজার বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। এতে বছরে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জনের মৃত্যু হয় বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর বজ্রপাত থেকে প্রাণহানি কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বজ্রপাতে ২২৬ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৯১, ২০১৭ সালে ৩৮৮ এবং ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন। ২০১৯ সালে বজ্রপাতে ১৯৮ জনের মৃত্যু হলেও ২০২০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫৫ জনে।
পরবর্তী বছরগুলোতে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল ২০২১ সালে ৩৬৩, ২০২২ সালে ৩৩৭, ২০২৩ সালে ৩২২, ২০২৪ সালে ২৭২ এবং ২০২৫ সালে ১৭৩ জন। এ হিসাবে ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেওয়া বছরভিত্তিক সংখ্যাগুলোর যোগফল ৩ হাজার ২৮৪ জন। এটি সংশ্লিষ্ট বছরগুলোর তথ্য যোগ করে পাওয়া হিসাব; আলাদা কোনো ঘোষিত মোট সংখ্যা নয়।
চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত বজ্রপাতে অন্তত শত মানুষের মৃত্যুর তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ এপ্রিল এক দিনেই সাত জেলায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়। হাওরাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বজ্রপাতের ঝুঁকি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
৩০ বছরের কালবৈশাখী ও বজ্রপাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘অ্যান ওভারভিউ অব থান্ডারস্টর্মস ওভার বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে বছরে সর্বোচ্চ ৬৬ দিন বজ্রপাতের ঘটনা ঘটতে পারে। মে মাসে বজ্রপাতের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি এবং ডিসেম্বরে সবচেয়ে কম। ২০২২ সালের জুনে বাংলাদেশ জার্নাল অব ফিজিক্স সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটিতে ১৯৮১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণা অনুযায়ী, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সবচেয়ে বজ্রপাতপ্রবণ। এরপর রয়েছে উত্তরাঞ্চল, মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল। গবেষণায় যুক্ত আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ, সিলেটের গোয়াইনঘাট, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, পাবনা, বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, রাজারহাট ও লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি। পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও সাতক্ষীরার মতো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতেও বজ্রপাত বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বজ্রপাত থেকে রক্ষায় একসময় তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপনের প্রকল্প নেওয়া হয়। তবে এসব উদ্যোগে তেমন সুফল না আসায় এখন সমন্বিত সমাধানের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক আজিজুর রহমানের মতে, ঘূর্ণিঝড়ের তুলনায় বজ্রপাত এখন প্রাণহানির বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানির সংখ্যা লাখ ছাড়ালেও উন্নত প্রস্তুতির ফলে তা অনেক কমেছে। অন্যদিকে বজ্রপাতে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
তিনি মনে করেন, বজ্রপাতের পূর্বাভাস থাকলেও তা মাঠপর্যায়ে, বিশেষ করে কৃষক ও খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট উন্নত হয়নি। ফলে আকাশে ঘন মেঘ দেখা দিলেও অনেক মানুষ সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেন না।
গত ২৭ এপ্রিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সংসদে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে প্রায়ই বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটছে। এসব এলাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫টির বেশি বজ্রপাত হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। আকাশে ঘন মেঘ জমলে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার মাধ্যমে প্রাণহানি কমানো সম্ভব। এ জন্য হাওরাঞ্চলে সাইরেনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হওয়ার পর অল্প সময়ে অতিভারি বর্ষণের ঘটনা বাড়ছে বলে সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। ফলে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের মোট পরিমাণ খুব বেশি না বাড়লেও স্বল্প সময়ে তীব্র বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে।
গত ৭ জুলাই চট্টগ্রামে ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা গত চার দশকের মধ্যে বন্দরনগরীতে এক দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। এতে নগরের বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যায়। এর প্রায় এক সপ্তাহ পর ঢাকায় প্রায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলামের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোয় আকস্মিক বন্যার প্রবণতা বেড়েছে।
হাইড্রো-ক্লাইমেট অ্যান্ড ওশান সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ড. মোহন কুমার দাশও মনে করেন, বাংলাদেশের বৃষ্টিপাতের ধরন ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। দীর্ঘ বিরতির পর অল্প সময়ে অতিভারি বৃষ্টিপাত হলে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে। এতে শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি ও নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়।
পাহাড়ধস বাংলাদেশের অন্যতম প্রাণঘাতী দুর্যোগ। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ধসের আশঙ্কা বাড়ে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলো এ ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জুনে টানা বর্ষণের মধ্যে পাহাড়ধসে ১৫০ জনের মৃত্যু হয়। ২০০৭ সালের জুনে এ সংখ্যা ছিল ১২৭। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাহাড়ধসে বছরভিত্তিক প্রাণহানি ছিল যথাক্রমে ১৯, ১৫, ১০, ১৭, ১৪, ২২ ও ৮ জন।
গত জুলাইয়ে অতিবৃষ্টির সময় কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ধসে ৩৪ জনের মৃত্যু হয় বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। ৫ থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২০ জন, কক্সবাজারে পাঁচজন, চট্টগ্রামে তিনজন, বান্দরবানে পাঁচজন ও রাঙামাটিতে একজনের মৃত্যু হয়।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা বলছে, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং আগাম সতর্কতার ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব।
কারিতাস বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান আলেকজান্ডার ত্রিপুরার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সাতটি জেলায় প্রায় ২৩ লাখ থেকে ২৭ লাখ মানুষ ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় বসবাস করেন।
তিনি বলেন, গত পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে ভূমিধসের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো হয়েছে। পার্বত্য এলাকার চরম ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ৩৩টি কার্যকরী এলাকা নিয়ে এ উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমানো। তাঁর দাবি, বড় ভূমিধসের ঘটনাগুলোর মধ্যেও ওই পরীক্ষামূলক এলাকার স্বেচ্ছাসেবক ও নির্ধারিত কার্যপদ্ধতির কারণে সেখানে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিকের মতে, দুর্যোগের পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট—দুই ধরনের কারণই কাজ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহে পরিবর্তন আনছে। এর প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরনে ব্যত্যয় ঘটতে পারে।
তিনি বজ্রপাত ও ভূমিধসের মতো স্বল্প সময়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া দুর্যোগের উদাহরণ দিয়ে বলেন, এসব ঘটনা আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ুবিদদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে তাঁর মতে, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে হবে এবং সেই ব্যবস্থা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
এল নিনোর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন তিনি। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে এবং তাপমাত্রা বাড়তে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে। স্বল্পমেয়াদি তাপপ্রবাহ, শীত ও বৃষ্টির তীব্রতার পরিবর্তনও বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে ড. মল্লিকের মতে, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা স্বাধীনতার পর থেকে সামগ্রিকভাবে কমেছে। কিন্তু কোনো ঘূর্ণিঝড় তৈরি হলে তা শক্তিশালী হয়ে ওঠার আশঙ্কা থেকে যায়। ফলে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা কমে আসা মানেই ঝুঁকি পুরোপুরি কমে যাওয়া নয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান জানিয়েছেন, পাহাড়ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় মানুষকে সচেতন করতে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা তৈরির কাজ চলছে। সরকারি-বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বজ্রপাত মোকাবিলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও তিনি জানান। কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হচ্ছে।
মৌসুমি বন্যা মোকাবিলায় আগাম পূর্বাভাস পাওয়ার পর প্রস্তুতি নেওয়া হয় বলে জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তাও নেওয়া হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা শুধু পূর্বাভাস দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সেই বার্তা এমনভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে, যাতে তাঁরা দ্রুত বুঝতে পারেন কখন, কোথায় এবং কীভাবে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে কৃষক, জেলে, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জন্য স্থানীয়ভাবে কার্যকর সতর্কবার্তা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান খানের মতে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। দুর্যোগের প্রভাব সমাজের সব শ্রেণির মানুষের ওপর পড়ে। তাই ব্যবস্থাপনাও হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক।
লেখক, গবেষক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা মনে করেন, স্থানীয় সরকার ও জনগণকে সম্পৃক্ত না করে কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। মানুষের প্রয়োজন ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও সতর্কবার্তা ব্যবস্থাকে মানুষের ব্যবহার উপযোগী করে তোলা জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে দুর্যোগের ধরন বদলাচ্ছে, কিন্তু ঝুঁকি মোকাবিলার মূলনীতি একই আগাম প্রস্তুতি, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং মানুষের অংশগ্রহণ। আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য সেই প্রয়োজনকেই সামনে এনেছে। দুর্যোগসহনশীল বাংলাদেশ গড়তে হলে ঘর, পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রস্তুত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।

