জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাস্ট গেট থেকে ‘চির উন্নত মম শির’ গেট পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের গাছ কাটা অব্যাহত রয়েছে। সড়ক সম্প্রসারণের জন্য চলমান উন্নয়নকাজের অংশ হিসেবে একের পর এক গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিলেও বাস্তবে গাছ রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ, ক্ষোভ আর স্মৃতিচারণ চললেও থামছে না গাছ কাটা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সড়কটি কেবল যাতায়াতের পথ নয়, বরং বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের কাছে স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থান। সড়কের দুই পাশে থাকা জারুল, সোনালু ও কৃষ্ণচূড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের অসংখ্য স্মৃতি। বসন্তে ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে ওঠা এই সড়ক একসময় ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আড্ডা, অবসর ও নানা আয়োজনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল।
কিন্তু সময়ের সাথে সেই পরিচিত দৃশ্য বদলে যাচ্ছে। সড়ক সম্প্রসারণের কাজ এগিয়ে নেওয়ার সাথে সাথে কাটা পড়ছে দীর্ঘদিনের পুরোনো গাছ। কোথাও চলছে খননকাজ, কোথাও পড়ে আছে গাছের ডাল-পালা, আবার কোথাও গাছ কেটে ফাঁকা করা হচ্ছে সড়কের পাশ। এতে একদিকে যেমন স্বাভাবিক চলাচলে ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে ক্যাম্পাসের পরিচিত সবুজ পরিবেশ।
এর আগে গাছ রক্ষার দাবিতে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গাছ কাটার ছবি, ভিডিও ও স্মৃতিচারণ প্রকাশ করে ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেকে। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন হলেও তা করতে গিয়ে ক্যাম্পাসের পরিবেশ ও দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত গাছগুলো নির্বিচারে হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়। তবে এসব প্রতিবাদ ও দাবির পরও গাছ কাটা অব্যাহত থাকায় প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ কি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকছে?
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফাস্ট গেট থেকে ‘চির উন্নত মম শির’ পর্যন্ত সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সড়কটির প্রস্থ ১৫ ফুট থেকে বাড়িয়ে ৪৫ ফুট করার কাজ চলছে। উন্নয়নকাজের অংশ হিসেবে সড়কের দুই পাশের গাছ অপসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা বলেন, ক্লাস শেষে ক্লান্ত বিকেলে গাছের ছায়ায় হেঁটে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, নিরিবিলি বিকেলে একা পথচলা, বৃষ্টিতে ভেজা মুহূর্ত, ফুলের সৌরভ আর নতুন শিক্ষার্থীদের প্রথম ক্যাম্পাস পরিচয়, অসংখ্য গল্পের নীরব সাক্ষী এই পথ। উন্নয়ন হোক, কিন্তু সেই উন্নয়নের ছোঁয়ায় যেন ক্যাম্পাসের সবুজ সৌন্দর্য ও স্মৃতির এই ঠিকানাটি হারিয়ে না যায়।
আর্থ ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. কামরুল হাসান বলেন, ফাস্ট গেট থেকে ‘চির উন্নত মম শির’ পর্যন্ত রাস্তাটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সুন্দর ও স্মৃতিবিজড়িত স্থান। সোনালু, জারুল ও কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের অসংখ্য স্মৃতি ও আবেগ জড়িয়ে আছে। উন্নয়নের নামে ১৫-১৬ বছরের পুরোনো এসব গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের সেই আবেগে আঘাত করবে। তাই উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অনুভূতিকে বিবেচনায় নিয়ে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানাই।
নাট্যকলা ও পরিবেশনা বিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও গ্রিন ক্যাম্পাসের উপদেষ্টা রাতুল মুন্সি বলেন, ক্যাম্পাসে গেলে এই রাস্তায় হাঁটতে পারি না, কষ্ট হয়। পরিকল্পনার অভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে বারবার গাছ ধ্বংস করা হচ্ছে। নতুন লাগানো ফিস্টেল পামগুলো ছায়া বা ফল দেবে না, বসন্তে জারুল-সোনালুর সেই সৌন্দর্যও থাকবে না। সমাবর্তনে সাবেক শিক্ষার্থীরা স্মৃতিবিজড়িত গাছের সাথে ছবি তোলেন, কিন্তু আমাদের সেই স্মৃতিগুলোই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন হোক, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ-প্রকৃতি ও স্মৃতি ধ্বংস করে নয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দফতরের পরিচালক প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান বলেন, রাস্তা সম্প্রসারণের জন্যই নতুন করে নির্মাণকাজ চলছে। উন্নয়নের অংশ হিসেবে ১৫ ফুটের রাস্তাটি ৪৫ ফুটে সম্প্রসারণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে বিকল্প কোনো নকশায় কাজ করার সুযোগ নেই। উন্নয়নের প্রয়োজনে গাছ কাটতে হলে তা করা হবে। তবে প্রয়োজনে গাছগুলো অন্যত্র প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে, পাশাপাশি নতুন করে গাছও লাগানো হবে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় যে জায়গাগুলো পেয়েছে, সেগুলো মূলত ভবন ও রাস্তা নির্মাণসহ উন্নয়নকাজের জন্যই।


