...|...|...

সারাদেশ

চট্টগ্রামে নিয়ন্ত্রণে আসছে না হাম, প্রতিদিন হাসপাতালে গড়ে ভর্তি ৫০ শিশু

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩:৩৫ | আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩:৩৯
Shares
চট্টগ্রামে নিয়ন্ত্রণে আসছে না হাম, প্রতিদিন হাসপাতালে গড়ে ভর্তি ৫০ শিশু

ছবি: টাইমস টুডে

চট্টগ্রামে নিয়ন্ত্রণে আসছে না হাম, প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনের বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এর মধ্যে উপসর্গ নিয়ে অনেক শিশুর মৃত্যুও হচ্ছে। তবে নমুনা পরীক্ষা না হওয়ায় এসব শিশুর মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে কি না, তা বলতে পারছেন না সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

চিকিৎসকরা বলছেন, হামের জটিলতার অন্যতম পরিণতি নিউমোনিয়া। আবার ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকেও নিউমোনিয়া হতে পারে। তবে হামের কারণে নিউমোনিয়ার পাশাপাশি আরও নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

চট্টগ্রামে গত মার্চ থেকে হামের প্রকোপ শুরু হয়। সেই থেকে বুধবার (২১ অক্টোবর) পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১০ হাজার ৩৭৩ জন। সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্যমতে, এর মধ্যে সুস্থ হয়েছে ১০ হাজার ৪৪ জন। হাম শনাক্ত হয়েছে ৮৩৭ জনের। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিশ্চিতভাবে হামে মারা গেছে তিনজন।

তবে চিকিৎসকরা বলছেন, হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের নমুনা পরীক্ষা তেমন হয়নি। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হাম ব্লকে উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের চাপ রয়েছে। শয্যাসংকটের কারণে অনেক রোগীকে সাধারণ ওয়ার্ডেও রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে সাধারণ শিশুদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

এমন অনেক শিশুকে পাওয়া যাচ্ছে, যারা অন্য রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। সুস্থ হওয়ার পর আবার হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে তারা। চিকিৎসকদের মতে, হামের রোগীদের জন্য আলাদা বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে অন্য রোগীদের সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতো।

চিকিৎসকরা বলছেন, হাম একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে ছড়ায়। প্রথমে জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ওঠে। শিশুদের মধ্যে এ রোগের ঝুঁকি বেশি। জটিলতা দেখা দিলে নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যা হতে পারে। সময়মতো এমএমআর টিকা গ্রহণ এ রোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায়।

তবে হাম নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাদের মতে, যেসব শিশু নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ পান করে এবং যাদের শরীরে ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি নেই, তাদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক কম হতে পারে। হাম প্রতিরোধে শিশুদের অপুষ্টি রোধ করাও জরুরি।

চিকিৎসকরা জানান, হাম সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে যেসব শিশু ভিটামিনের ঘাটতি ও অপুষ্টিতে ভোগে, তাদের ক্ষেত্রে হামে আক্রান্ত হওয়ার পর নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। নিয়মিত চিকিৎসায় বেশিরভাগ শিশু সুস্থ হয়ে ওঠে। হাম ছোঁয়াচে হওয়ায় আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন।

এ রোগের উপসর্গের বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। বিশেষ করে কোনো শিশুর জ্বরের সাথে কফ, কাশি, চোখ লাল হওয়া ও শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। কারণ, হামের জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া হতে পারে। শিশুকে বাসায় রেখে চিকিৎসা নিতে দেরি করলে বিপদ বাড়তে পারে। তাই এ বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। হাম নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

এদিকে সম্প্রতি চট্টগ্রামে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৪৬ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। সাধারণত ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম টিকা দেওয়া হয়। অর্থাৎ আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই সংক্রমিত হয়েছে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের বয়স ছিল ২ মাস থেকে ১১ বছর পর্যন্ত। তাদের ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ গ্রামীণ বা প্রত্যন্ত এলাকার এবং ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবারের। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৩১ শতাংশ তীব্র বা একিউট পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল।

টিকা না নেওয়ার কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, টিকাবিহীন শিশুদের ৫২ শতাংশের ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব বা টিকা দেওয়ার তারিখ ভুলে যাওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩০ শতাংশ শিশু অসুস্থ থাকায়, ৮ শতাংশ মায়ের অসুস্থতার কারণে, ৪ শতাংশ টিকার ভয়ে এবং ৪ শতাংশ টিকা কার্ড হারিয়ে ফেলায় টিকা নেয়নি।

চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিঞা বলেন, ‘হামের পরিস্থিতির এখনো উন্নতি হচ্ছে না। প্রতিদিনই হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী ভর্তি হচ্ছে। উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের মধ্যে টিকা নিয়েছে, টিকা নেয়নি এবং এক ডোজ টিকা নিয়েছে, এমন রোগীও পাচ্ছি।’

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের আলাদাভাবে চিকিৎসা দিচ্ছি। নির্ধারিত সংখ্যার রোগীর চাপ বাড়ছে, এটি ঠিক। তবে আমরা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করছি।’

তিনি বলেন, চমেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাব্যবস্থা রাখা হলেও ক্রমাগত রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় সংকট সামাল দিতে অতিরিক্ত জরুরি প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়েছে। একই সাথে শয্যা ও জায়গার সংকটের কারণে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে অন্য রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।