...|...|...

বিশ্ব

কাশ্মীরে জুমার খুতবাও নিয়ন্ত্রণ করছে ভারত

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১:৫০ | আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ২:২২
Shares
কাশ্মীরে জুমার খুতবাও নিয়ন্ত্রণ করছে ভারত

ছবি: সংগৃহীত

ভারত-শাসিত কাশ্মীরের সব মসজিদে অভিন্ন জুমার খুতবা চালুর প্রস্তাব ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীর ওয়াকফ বোর্ডের এ উদ্যোগের সমালোচনা করে ধর্মীয় নেতা ও রাজনীতিবিদেরা অভিযোগ করেছেন, এর মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। তাঁদের মতে, খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণের দায়িত্ব ধর্মীয় পণ্ডিতদের, প্রশাসনিক সংস্থার নয়।

সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, বিজেপির সাথে সংশ্লিষ্ট জম্মু-কাশ্মীর ওয়াকফ বোর্ডের প্রধান দারাকশান আন্দ্রাবি গত সপ্তাহান্তে এ প্রস্তাবের কথা জানান। ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় অভিন্ন খুতবা ভূমিকা রাখতে পারে। খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণের দায়িত্ব বোর্ডের একটি কমিটির ওপর থাকবে বলেও জানান তিনি। তার দাবি, ধর্মীয় পণ্ডিতেরা খুতবার বিষয়বস্তু অনুমোদন করবেন এবং এ প্রক্রিয়ায় কোনো সরকারি কর্মকর্তা যুক্ত থাকবেন না।

রবিবার এ বিষয়ে প্রায় দেড় হাজার ধর্মীয় পণ্ডিত ও প্রচারককে নিয়ে বৈঠক করে ওয়াকফ বোর্ড। তাঁদের কেউ সরাসরি, আবার কেউ অনলাইনে বৈঠকে অংশ নেন। রাজৌরির এক আলেমের অভিযোগ, বৈঠকে আন্দ্রাবি প্রতি শুক্রবার একটি নির্ধারিত খুতবা পাঠের নির্দেশ দেন। তার দাবি, খুতবার বিষয়বস্তু ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে—এমন আশঙ্কা জানিয়ে আপত্তি তোলা হলেও তা গুরুত্ব পায়নি। ওই আলেম আরও বলেন, খুতবা নির্ধারণের কমিটিতে কারা থাকবেন, তা স্পষ্ট করা হয়নি। তবে আন্দ্রাবির ভাষ্য, এ উদ্যোগ নিয়ে গত চার বছর ধরে কাজ চলছে।

আন্দ্রাবির এ প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেছেন কাশ্মীরের প্রধান ধর্মীয় নেতা মীরওয়াইজ উমর ফারুক। মঙ্গলবার তিনি একে ধর্মীয় বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার নেতৃত্বাধীন ধর্মীয় সংগঠনগুলোর যৌথ মঞ্চ মুত্তাহিদা মাজলিস-ই-উলামা জানায়, খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণের দায়িত্ব ইসলামি পণ্ডিতদের; প্রশাসনিক সংস্থার নয়। অঞ্চলটির নির্বাচিত প্রধান ও ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ওমর আবদুল্লাহও এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন।

সমালোচনার মুখে আন্দ্রাবি পরে তার বক্তব্যের পরিধি সীমিত করেন। তিনি জানান, আত্মহত্যা, মানসিক আঘাত ও মাদকাসক্তির মতো সামাজিক বিষয় নিয়ে আলোচনার দায়িত্ব স্বাধীন ধর্মীয় পণ্ডিত ও প্রচারকদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ

কাশ্মীরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে অঞ্চলটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে। এর আগে বিশেষ মর্যাদার আওতায় স্থানীয় বাসিন্দাদের ভূমি ও আবাসসংক্রান্ত কিছু বিশেষ অধিকার এবং স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ ছিল। দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই কাশ্মীরকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে আসছে। ১৯৮৯ সাল থেকে অঞ্চলটিতে সশস্ত্র বিদ্রোহ ও সংঘাত চলছে; নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগও এ সংঘাতের পটভূমির অংশ।

বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর ২০২৪ সালে সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত। নয়াদিল্লি থেকে নিয়োগ করা প্রশাসকের হাতে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেন। একই সময়ে স্থানীয় ওয়াকফ আইন পরিবর্তন করে দেশব্যাপী প্রযোজ্য আইন চালু করা হয়। এতে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামোর ক্ষমতা বেড়েছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ।

কাশ্মীরের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নঈম আখতার বলেন, ইসলামের ইতিহাসে সুলতান বা খলিফাদের শাসনামলে কেন্দ্রীয়ভাবে খুতবা নির্ধারণের নজির থাকলেও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। তার মতে, ধর্মীয় বক্তাদের যেকোনো বিষয়ে কথা বলার স্বাধীনতা থাকা উচিত। ওয়াকফ বোর্ডের দায়িত্ব ধর্মীয় সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা দেখা, ধর্মীয় বক্তারা কী বলবেন তা নির্ধারণ করা নয়। বোর্ডের প্রধানের সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক থাকায় এ উদ্যোগ নিয়ে সন্দেহ আরও বেড়েছে বলেও তিনি মনে করেন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য পুলিশের একটি চার পৃষ্ঠার ফরম বিতরণের ঘটনাও বিতর্ক তৈরি করে। ওই ফরমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ও জীবমিতিক তথ্য চাওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সমালোচকদের আশঙ্কা, এ ধরনের উদ্যোগ ধর্মীয় ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি বাড়াতে পারে।

শ্রীনগরের প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক জামিয়া মসজিদেও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ রয়েছে। ঈদ ও শবে কদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষেও মসজিদটি প্রায়ই বন্ধ রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে ধর্মীয় নেতাদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ কাশ্মীরের মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয়, মর্যাদা ও অধিকারের ওপর আঘাত।

মীরওয়াইজ উমর ফারুকের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ এবং তাঁকে জুমার খুতবা দিতে বাধা দেওয়ার ঘটনাও সমালোচনার মুখে পড়েছে। গাজায় সংঘাতের মতো বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার আশঙ্কা থাকলেও তাঁকে খুতবা থেকে বিরত রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া বড় বড় মাজারে দীর্ঘদিনের কিছু ধর্মীয় প্রথা বন্ধের উদ্যোগ নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মাজারগুলোতে ভক্তদের মধ্যে হলুদ ভাত বিতরণের প্রচলিত রীতি বন্ধের চেষ্টা চালিয়েছে ওয়াকফ বোর্ড বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সুফি ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এ প্রথা বহুদিন ধরে চলে আসছে। ২০২২ সালে বোর্ড নযর-নিয়াজের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক, মাজারের তত্ত্বাবধায়ক ও খাদেমদের দেওয়া অনুদান নিয়েও বিধিনিষেধ আরোপ করে। সমালোচকদের অভিযোগ, এসব অনুদান সংগ্রহের প্রচলিত ব্যবস্থা বন্ধ করে নতুন দানবাক্স বসিয়ে অর্থ বোর্ডের তহবিলে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

খুতবার বিষয়বস্তু নিয়ে ভিন্নমত

কাশ্মীরের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ নূর আহমদ বাবা বলেন, অঞ্চলটির রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ধর্মের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, ধর্মীয় নেতাদের সমর্থন থাকলে সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য হতে পারে। মাদকাসক্তি, বিয়েতে বিলম্ব, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামাজিক সম্প্রীতির মতো বিষয় জুমার খুতবায় আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক।

তবে শ্রীনগরের এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিস্তারের মধ্যে এ ধরনের বিধিনিষেধের উদ্দেশ্য প্রতিবাদ ও ভিন্নমত আগেভাগেই দমন করা হতে পারে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, উজ্জয়িনী ও সাহারানপুরে মসজিদ ভাঙার মতো ঘটনা ভারতের উগ্র ডানপন্থী শক্তির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কাশ্মীরের মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে সেখানেও তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে, মসজিদে অভিন্ন জুমার খুতবা চালুর প্রস্তাব কেবল ধর্মীয় আলোচনার বিষয়েই সীমাবদ্ধ নেই; এটি কাশ্মীরে ধর্মীয় স্বাধীনতা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় পরিচয় ও অধিকারের প্রশ্নকেও সামনে এনেছে।