...|...|...

বিশ্ব

‘বিশেষ অঙ্গে বুট দিয়ে মেরেছে’

দিল্লিতে আটক বিক্ষোভকারীদের মুখে পুলিশি নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১১:৪৮ | আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১২:৫৪
Shares
দিল্লিতে আটক বিক্ষোভকারীদের মুখে পুলিশি নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আটক হওয়া শিক্ষার্থী, সমাজকর্মী ও বিক্ষোভকারীরা পুলিশের বিরুদ্ধে মারধর, শারীরিক ও যৌন হয়রানি এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ তুলেছেন। কারও অভিযোগ, পুলিশ তাদের চুল টেনে বাসে তুলেছে, পোশাক টেনে মাথার ওপর তুলে দিয়েছে, আবার কাউকে বুট দিয়ে বিশেষ অঙ্গে আঘাত করা হয়েছে। কয়েকজন বিক্ষোভকারী শরীরের আঘাতের চিহ্নও দেখিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে বিবিসি। অভিযোগের বিষয়ে দিল্লি পুলিশের বক্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

আটক হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন, নির্যাতন ও অপমানের শিকার হওয়ার পরও তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান এ বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

‘আমার টি-শার্ট টেনে মাথার উপরে তুলে দিয়েছিল’

বিবিসি জানায়, আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ও স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) সদস্য শরণ্যা শর্মাকে ১১ অক্টোবরের বিক্ষোভ চলাকালে আটক করা হয়। তার অভিযোগ, নারী পুলিশকর্মীরা তার পোশাক টেনে তুলছিলেন এবং পুরুষ কমান্ডোরা জোর করে তাকে বাসে তুলেছিলেন।

শরণ্যা বলেন, “একজন নারী পুলিশকর্মী আমার টি-শার্ট টেনে মাথার উপরে তুলে দিয়েছিল। আমাকে অপমান করার জন্যই করেছিল।”

তার চুল টানা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন এই শিক্ষার্থী। বাসে তোলার সময় তার পা দরজায় আটকে যায় বলে জানান তিনি। শরণ্যার ভাষ্য, ভেতরে থাকা চারজন নারী চিৎকার করে দরজা খোলার অনুরোধ করলেও কমান্ডোরা প্রায় ৩০ সেকেন্ড ধরে দরজা ঠেলতে থাকেন। এতে তার পায়ে আঘাত লাগে।

শরণ্যার দাবি, সকাল ১১টার দিকে তাকে আটক করে নাঙ্গলোইয়ের একটি আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়। গভীর রাতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখানে খাবার, পানীয় জল ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সুবিধারও অভাব ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

‘আটকের উদ্দেশ্য ছিল ভয় সৃষ্টি করা’

এসএফআইয়ের দিল্লি সভাপতি ও ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের শিক্ষার্থী নাদিয়াকে ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ থেকে আটক করা হয়। পরে তার শরীরেও আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। এরপরও ১২ অক্টোবর ইন্ডিয়া জোটের বিক্ষোভে অংশ নেন তিনি।

নাদিয়ার অভিযোগ, আটক অবস্থায় নারী পুলিশকর্মীরা তার চুল টেনেছেন, চিমটি কেটেছেন এবং পা দিয়ে আঘাত করেছেন। পুলিশ তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে বাধা দেওয়ায় তাকে মারধর করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

নাদিয়া বলেন, “পুরো বাসে আমি ছাড়া অন্য একটা মেয়ে ছিল। এবারের আটকের ঘটনা খুবই কষ্টদায়ক ছিল। জেনেশুনে পুলিশকর্মীরা টেনে টেনে বাসে তুলছিল, চিমটি কাটছিল। পা দিয়ে মারছিল আমাদের, গলা চেপে ধরে বসানো হচ্ছিল।”

তার অভিযোগ, বাসে যাওয়ার সময় পুলিশকর্মীরা তাদের কোথায় থাকেন, তা জানতে চান এবং বাড়ি ফিরতে পারবেন না বলে ভয় দেখান। ফোন বের করে ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে একজন পুলিশকর্মী তা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ফোন ফিরিয়ে নেওয়ার পর চারজন পুলিশকর্মী তার ওপর চড়াও হন বলে দাবি করেন নাদিয়া।

নিজের হাতের আঘাতের চিহ্ন দেখিয়ে তিনি বলেন, “তারপরের ১৫ মিনিট আমার উপর নৃশংসতা হয়েছে। অত্যাচার চালানোর মতোই ছিল সেটা।”

নাদিয়ার আরও অভিযোগ, পুলিশ তাকে আধমরা অবস্থায় ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। অন্য নারীদের শার্ট টেনে মাথার ওপর তুলে দিয়ে অপমান করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

নাদিয়ার মতে, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতেই এভাবে আটক করা হচ্ছে। ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া বা এসআইআর নিয়ে প্রশ্ন তোলা বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ বলে মনে করেন তিনি। জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন এই শিক্ষার্থী।

তিন ঘণ্টা বাসে আটকে রেখে মারধরের অভিযোগ

দিল্লিতে পিএইচডি গবেষণারত নোভেল ১০ অক্টোবর ভগৎ সিংয়ের পোস্টার হাতে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাকে আটক করার সময় পুলিশকে তার পোস্টার নিয়ে নিতে দেখা যায়।

নোভেলের অভিযোগ, তাকে দিল্লি ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের একটি কমলা রঙের বাসে জোর করে তোলা হয়। বাসে ওঠানোর সময় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার পর তিন-চারজন পুলিশকর্মী তাকে মারধর করেন। তার জামা ছিঁড়ে দেওয়া হয় এবং লাথি মেরে চশমা ভেঙে দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

নোভেল বলেন, “ওই বাসটা কোথাও যায়নি। এক জায়গাতেই দাঁড় করানো ছিল। তিন ঘণ্টা এভাবেই চলেছে। ১০-১৫ মিনিট অন্তর এসে এসে আমাকে থাপ্পর মারছে।”

তার অভিযোগ, বাসে তিনি একাই ছিলেন। পুলিশকর্মীরা তাকে বলেছিলেন, বাসে একা থাকায় তার সঙ্গে কী ঘটছে, তা কেউ জানতে পারবে না। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভীত হয়ে পড়েছিলেন বলেও জানান তিনি। প্রায় তিন ঘণ্টা পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

‘যৌনাঙ্গে বুট দিয়ে মেরেছে’

১১ অক্টোবর কনট প্লেসে বিক্ষোভের সময় আটক হওয়া সমাজকর্মী অর্জুনের অভিযোগ, পুলিশ তার বুকে ও যৌনাঙ্গে লাথি মেরেছে, ঘুষি দিয়েছে এবং গলা চেপে ধরেছে। এতে তার পোশাকও ছিঁড়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি।

অর্জুনের ভাষ্য, প্রিজন ভ্যানে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে ঘুষি মারা হয়। তিনি মাটিতে পড়ে গেলে ভেতরে থাকা পুলিশকর্মীরা তাকে একে অন্যের দিকে ঠেলে দিয়ে মারধর করেন। একজন তার যৌনাঙ্গে বুট দিয়ে আঘাত করেন, আরেকজন বুকে লাথি মারেন এবং অন্য একজন তার গলা চেপে ধরেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অর্জুন আরও দাবি করেন, বাসে কয়েকজন নাবালকও ছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন আহত হয়েছে, এমনকি কারও কারও হাড় ভেঙেছে বলেও অভিযোগ তার। পুলিশ এমনভাবে আঘাত করছিল, যাতে শরীরে স্পষ্ট দাগ না থাকে—এমন দাবিও করেন তিনি।

বিভিন্ন বিক্ষোভকারী বিবিসিকে ঘটনার ভিডিও দেখিয়েছেন। তবে অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আটক সাংবাদিকরাও

১০ ও ১১ অক্টোবর বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে একাধিক সাংবাদিক আটক হন। সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) তথ্য অনুযায়ী, দিল্লি, আহমেদাবাদ ও পুনেতে অন্তত ৩৭ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৩৫ জনের বেশি ছিলেন দিল্লির সাংবাদিক।

সিপিজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটক সাংবাদিকদের মধ্যে ‘স্ক্রল’, ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’, ‘নিউজলন্ড্রি’ এবং ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস হিন্দি’র সাংবাদিকরাও ছিলেন।

১০ অক্টোবর আটক সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন স্ক্রল ডট ইনের শোয়েব দানিয়াল ও আয়ুষ তিওয়ারি, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের অনুষ্কা ভরদ্বাজ এবং নিউজলন্ড্রির অশ্বিনী কুমার সিং, আস্থা সব্যসাচী ও অনমোল প্রীতম। নিউজলন্ড্রির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের সাংবাদিকদের মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়েছিল।

সিপিজের তথ্য বলছে, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস হিন্দির সাংবাদিক শাশ্বত, সিয়া ও বিজয় কুমারকেও ১১ অক্টোবর আটক করা হয়। তাদের দাবি, প্রেস কার্ড দেখানোর পরও পুলিশ জোর করে বাসে তুলে নেয় এবং প্রায় ৪৫ মিনিট পর ছত্রসাল স্টেডিয়ামের কাছে নামিয়ে দেয়।

বিক্ষোভস্থল থেকে দূরে নেওয়া হয় আটক ব্যক্তিদের

২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ১০ অক্টোবর আরও তীব্র হয়। বিক্ষোভকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন এবং ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

১০ অক্টোবর যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। একই সময়ে দিল্লিতে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা জারি ছিল।

দিল্লি পুলিশের যুগ্ম কমিশনার নূপুর প্রসাদ গত শুক্রবার জানিয়েছিলেন, জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছিলেন তিনি।

বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ থেকে ১২ অক্টোবরের মধ্যে দিল্লি পুলিশকে সহায়তা করতে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২২১ কোম্পানি, অর্থাৎ প্রায় ২৩ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। সিপিজের তথ্য অনুযায়ী, দিল্লি পুলিশের অন্তত ১৫ হাজার সদস্যও দায়িত্ব পালন করেন।

আটক বিক্ষোভকারীদের বাওয়ানা, মুন্ডকা, বুরারি ও নারেলার মতো দূরবর্তী এলাকায় নেওয়া হয়েছিল। সিপিজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকজন সাংবাদিককেও বিক্ষোভস্থল থেকে অনেক দূরের আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে তাদের পরিবার ও সহকর্মীদের পক্ষে খোঁজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের আটক নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ

১১ অক্টোবর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করে, শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের বেআইনিভাবে আটক করা যায় না। আদালত আরও জানায়, কাউকে আটক করা হলে আইনে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

আটকের অভিজ্ঞতায় অনেকে মানসিক চাপের মধ্যে থাকলেও দিল্লিতে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। কেউ কেউ সেই অভিজ্ঞতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন, আবার অনেকে নতুন করে আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন।

প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত বিক্ষোভকারীদের তোলা নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে দিল্লি পুলিশের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।