বিশ্বজুড়ে চরম দারিদ্র্য ও নিদারুণ অভাব দূর করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আজ উদযাপিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস’। ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতিবছর ১৭ অক্টোবর জাতিসংঘের উদ্যোগে এই দিবসটি পালন করা হয়ে আসছে, যা বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দারিদ্র্য বিমোচনকে অগ্রাধিকার দিতে উৎসাহিত করে।
দিবসটি উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও কমিউনিটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের নীতিনির্ধারক ও সরকারপ্রধানদের প্রতি দারিদ্র্যবিরোধী লড়াইকে তাদের বৈদেশিক নীতির মূল কেন্দ্রে রাখার জোরালো আহ্বান জানিয়ে থাকে। এর পাশাপাশি ‘অ্যাকশনের ডাক’ সংবলিত পিটিশনে স্বাক্ষর সংগ্রহ, সচেতনতামূলক কনসার্ট ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন এবং আন্তঃধর্মীয় জমায়েতের মাধ্যমে দারিদ্র্যপীড়িতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের মতো নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।
দিবসের পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস পালনের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৮৭ সালের ১৭ অক্টোবর। ওই দিন ফ্রান্সের প্যারিসে চরম দারিদ্র্য, সহিংসতা ও ক্ষুধার শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের শ্রদ্ধা জানাতে ১ লাখের বেশি মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত থেকেই বিশ্বজুড়ে ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠন ১৭ অক্টোবরকে দারিদ্র্য দূরীকরণে যৌথ অঙ্গীকার নবায়নের দিন হিসেবে পালন করে আসছে। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৭/১৯৬ নম্বর রেজুলেশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭ অক্টোবরকে ‘আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কোপেনহাগেন সামাজিক শীর্ষ সম্মেলনের পর প্রথম ‘জাতিসংঘ দারিদ্র্য বিমোচন দশক (১৯৯৭-২০০৬)’ ঘোষণা করে। এরপর ২০০০ সালের মিলেনিয়াম সামিটে বা সহস্রাব্দ সম্মেলনে বিশ্ব নেতারা ২০১৫ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের শিকার মানুষের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছিলেন।
ডাকটিকিট ও প্রতীকী প্রকাশনা
এই দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরতে ইউনাইটেড নেশনস পোস্টাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন পূর্বে ‘আমরা দারিদ্র্য দূর করতে পারি’ প্রতিপাদ্যের ওপর ভিত্তি করে ছয়টি স্মারক ডাকটিকিট এবং একটি সুভ্যেনির কার্ড বা স্মারক কার্ড প্রকাশ করেছিল। এই ডাকটিকিট ও কার্ডগুলোতে শিশুদের চিত্রসহ বিভিন্ন মানুষের যৌথভাবে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নানান ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। ছবিগুলোতে গাঢ় রঙ এবং চমৎকার বৈপরীত্যের নান্দনিক ব্যবহার করা হয়েছিল। ১২৪টি দেশের ১২ হাজারেরও বেশি শিশুর আঁকা ছবির মধ্য থেকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেরা ছয়টি নকশা বেছে নিয়ে এই স্মারক ডাকটিকিটগুলো তৈরি করা হয়েছিল।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯৩ সালে প্রথমবার এই দিবসটি পালন করলেও, বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ ১৯৮৭ সাল থেকেই প্রতিবছর ১৭ অক্টোবর নিয়মিতভাবে এই দিনটি পালন করে আসছেন। বৈশ্বিক এই দিবসটি কোনো সরকারি ছুটির দিন নয়, বরং এটি একটি বিশ্বব্যাপী পালিত সচেতনতামূলক দিবস।
বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ক্ষুদ্রঋণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে নেওয়া নানা পদক্ষেপের সুফল মিললেও বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করে নিম্ন আয়ের মানুষদের সুরক্ষা দেওয়া এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে চরম দারিদ্র্য সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলতে হলে রাষ্ট্রগুলোর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বৈষম্য কমানোর বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। আজকের এই দিনে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান ঘুচিয়ে একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব গড়ে তোলার নতুন করে শপথ নিচ্ছে বিশ্ববাসী।

