স্পেনে ইউরোপের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৮ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হওয়ার পর সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশটি। ঘটনার পর দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারী দলগুলো সারা রাত ধরে বগি কেটে হতাহতদের উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করে। অন্যদিকে, চলতি বছরে স্পেনে দ্বিতীয়বারের মতো উচ্চগতির ট্রেন দুর্ঘটনার জেরে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানীতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে এসেছেন। এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্পেনীয় গণমাধ্যম টিভিইর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত রাতে রাজধানী মাদ্রিদে পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ভবনের সামনে প্রায় দেড় হাজার মানুষ সমবেত হয়ে মন্ত্রীদের অপসারণের দাবিতে স্লোগান দেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল ও ফ্লেয়ার নিক্ষেপ করলে শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিয়ার গ্যাস ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এখন পর্যন্ত এতে কোনো হতাহত বা গ্রেফতারের খবর পাওয়া যায়নি। তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বিক্ষোভকারীদের হাতাহাতি ও সংঘর্ষ চলছে এবং জনতা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিক্ষোভকারীদের হাতে (অপরাধীরা নিপাত যাক, ৭৮-এর শাসনব্যবস্থা ধ্বংস হোক) লেখা ব্যানার দেখা যায়।
পুলিশ সদস্যরা যখন ছত্রভঙ্গ করতে অগ্রসর হন, তখন বিক্ষোভকারীরা পরিবহনমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে ‘অস্কার পুয়েন্তে, মৃত্যুর মন্ত্রী (মিনিস্টার অব ডেথ)’ বলে চিৎকার করে স্লোগান দিতে থাকেন।
রেল নিরাপত্তা বজায় রাখার দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার স্পেনের রেল চালকদের সংগঠন ‘সেমাফ’ সারাদেশে কর্মবিরতি পালন করবে বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্পেনের ঐতিহ্যবাহী স্পিড রেল ব্যবস্থা
স্পেনের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ককে দেশটির অন্যতম বড় অর্জনকথা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ট্র্যাক মাইলেজের দিক থেকে চীনের পরেই বিশ্বে স্পেনের অবস্থান দ্বিতীয়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিষেবা দিয়ে আসা এই নেটওয়ার্কে চলতি বছরের আগে বড় ধরনের কোনো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেনি।
জাতীয় নির্বাচনের মাত্র চার সপ্তাহ আগে জলপাই বাগান পরিবেষ্টিত এক শান্ত রেলপথে বুধবারের এই ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে, যা মুহূর্তে রক্তক্ষয়ী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় টোলেডো প্রদেশে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। সেখানে প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে ৬০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন এবং ডজন ডজন আহতদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে গত জানুয়ারি মাসে দক্ষিণ স্পেনে একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনের পাশে সজোড়ে ধাক্কা দিলে ৪৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল।
গত বছর প্রায় সাড়ে চার কোটি যাত্রী পরিবহন করা এই বিশ্বস্ত রেল নেটওয়ার্কে পর পর দুটি ট্র্যাজেডি জনগণের আস্থা নাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সানচেজ নিরপেক্ষ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি বৃহস্পতিবার থেকে তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে সানচেজ সরকার।
বাড়িভাড়া সংকট ও জমানো ক্ষোভের বিস্ফোরণ
স্পেনে সাধারণ মানুষ ইতিমধ্যেই আবাসন সংকট এবং হু হু করে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলনে সোচ্চার ছিল। এই ট্রেন দুর্ঘটনা তাদের সেই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে।
মূলত গত মাসে পুলিশ মাদ্রিদে আবাসনচ্যুত করার জন্য ৮৭ বছর বয়সী বৃদ্ধা মারিকারমেন আবাকালকে তার আজীবনের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে জোরপূর্বক বের করে দিলে এই আন্দোলন জোরদার হয়। দরজায় ধাক্কা দিয়ে স্ট্রেচারে করে বৃদ্ধাকে বের করার দৃশ্য সারাদেশে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে।
বড় শহরগুলোতে লাগামহীন বাড়িভাড়া ও ক্রয়ের খরচে অতিষ্ঠ মানুষ ওই ঘটনার পর প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। সপ্তাহজুড়ে হাজার হাজার মানুষ চাবি বাজিয়ে ও বাঁশি বাজিয়ে মাদ্রিদের রাস্তায় নেমে সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল, যা ট্রেন দুর্ঘটনার পর রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।


