...|...|...

চট্টগ্রাম

৬৫৪ কোটি টাকার ডেমু এখন লাইফ সাপোর্টে

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
আপডেট: ২২ ঘণ্টা আগে
৬৫৪ কোটি টাকার ডেমু এখন লাইফ সাপোর্টে

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে আমদানি করা ২০ সেট ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ডেমু) ট্রেনের জায়গা হয়েছে হাসপাতালের (ওয়ার্কশপ) লাইফ সাপোর্টে। এর আগে কয়েকবার অর্থ খরচ করে মেরাতের পরে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ইতিহাসে বহুল আলোচিত ডেমু ট্রেন প্রকল্প আজ রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়, দুর্বল পরিকল্পনা এবং অব্যবস্থাপনার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে আলোচিত। যাত্রীসেবার মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চীন থেকে আমদানি করা শত শত কোটি টাকার এসব ট্রেন এখন কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, আর প্রকল্পটি পরিণত হয়েছে রেলওয়ের অন্যতম ব্যর্থ উদ্যোগে। 

২০১৩ সালে ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে চীন থেকে ২০ সেট আধুনিক ডেমু ট্রেন সংগ্রহ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ট্রেনগুলোর আয়ুষ্কাল ২৫ থেকে ৩০ বছর হবে বলে আশ্বাস দিলেও বাস্তবে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই সেগুলোর কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ২০১৯ সাল থেকে ডেমু ট্রেনের সব ধরনের যাত্রী পরিবহন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘ডেমু ট্রেন এখন জাদুঘরে নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। অথচ কম দূরত্বে আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য চীন থেকে আমদানি করা হয় ব্যতিক্রমী এই ডেমু ট্রেন। ট্রেনগুলোর সামনে-পেছনে দুই দিকেই আছে ইঞ্জিন। স্বল্প দূরত্বে দ্রুত চলাচলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রেনগুলো রেলওয়েতে সংযোজন করা হয়।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল কমলাপুর-নারায়ণগঞ্জ রুটে দুই সেট ট্রেন দিয়ে এর যাত্রা শুরু করে। এরপর ঢাকা-টঙ্গী, ঢাকা-জয়দেবপুর, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ, সিলেট-আখাউড়া, কমলাপুর-আখাউড়া, চট্টগ্রাম-কুমিল্লা, নোয়াখালী-লাকসাম, লাকসাম-চাঁদপুর, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট, পার্বতীপুর-লালমনিরহাট, পার্বতীপুর-পঞ্চগড় রুটে এবং সর্বশেষ চট্টগ্রাম-বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম-দোহাজারী বাকি ট্রেনগুলো চালু হয়। আমদানির পর পূর্বাঞ্চলে ১৮ সেট ট্রেন এবং বাকি দুই সেট পশ্চিমাঞ্চলে বরাদ্দ দেয়া হয়।

তবে ট্রেনগুলোর চলাচল বন্ধ হলেও বন্ধ হয়নি এগুলোকে ঘিরে ব্যয় ও বিতর্ক। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ডেমু ট্রেন মেরামতের নামে ব্যয় করা হয় ২ কোটি ৯৮ লাখ ৩৩ হাজার ৪০ টাকা। পরবর্তী সময়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে জ্বালানি ও যন্ত্রাংশ ক্রয়ের জন্য আরও ব্যয় করা হয় ২ কোটি ৪৬ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪১ টাকা। অর্থাৎ দুই অর্থবছরে ডেমু ট্রেনের পেছনে মোট ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ৪৫ লাখ ১ হাজার ৭৮১ টাকা, যদিও ওই সময় ট্রেনগুলো কোনো যাত্রীসেবা প্রদান করেনি। ফলে এই ব্যয়কে এখন সম্পূর্ণ অপচয় হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেলওয়ের অডিট সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুরের পার্বতীপুর এবং চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ে কার্যালয় থেকে এসব ব্যয় সম্পন্ন করা হয়েছিল।

ডেমু ট্রেন প্রকল্পের ব্যর্থতা অবশ্য রেলওয়ের একক কোনো ঘটনা নয়। রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অপরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং ব্যক্তি স্বার্থনির্ভর সিদ্ধান্তের কারণেই একের পর এক প্রকল্প ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দুর্নীতি ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে সেবার মান উন্নয়ন তো দূরের কথা, পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।’

তিনি আরও জানান, বর্তমানে রেলওয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ। অনেক রেললাইন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কোচ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেই যাত্রী পরিবহন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও যাত্রীসেবার মানে দৃশ্যমান উন্নতি আসেনি; বরং অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও ব্যর্থতার অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, গত এক যুগে রেল খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যাত্রীসেবার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হয়নি। প্রতিনিয়তই নানা ভোগান্তির মুখোমুখি হচ্ছেন যাত্রীরা।

ডেমু ট্রেনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন এবং রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন রিসিভ না করায় এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে রেলওয়ের বর্তমান পরিস্থিতি রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। খাতটির সামগ্রিক কার্যকারিতা ও সেবার মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।