টাঙ্গাইলের বাসাইলে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুতে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগ ঘিরে আবারও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি 'টক অব দ্য কান্ট্রি'তে পরিণত হয়। তবে ঘটনার অনুসন্ধানে গঠিত দুটি পৃথক তদন্ত কমিটির বিপরীতমুখী প্রতিবেদনে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে।
এ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদফতর ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মো. ছাদেক পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত শেষে বাসাইল উপজেলা তদন্ত কমিটি সত্যতা পেলেও কেন্দ্রীয় কমিটি সত্যতায় পায়নি বলে উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে আবার নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।
গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক আদেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটিতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আহাদি হোসেনকে আহ্বায়ক এবং বাসাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রবিউল আলম ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেনকে সদস্য করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার এলজিইডির নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী রড কম ব্যবহার করার কারণে ঢালাই ও সিমেন্টের খালি ব্যাগের নিচে বাঁশের ফালি ঢালাইয়ের অতিরিক্ত সাপোর্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে, যা কারিগরিভাবে সঠিক হয়নি। স্লাব ঢালাই অন্য স্থানে করে সেতুর ওই স্থানে স্থাপন করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। রডের পরিমাণ ১০+৫=১৫টির স্থলে পাওয়া যায় ৪+৪=৮টি। ঢালাইয়ের পুরুত্ব ৪ ইঞ্চির স্থলে পাওয়া যায় ২.৫-৩ ইঞ্চি পর্যন্ত। কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে ঢালাই করার কথা থাকলেও রাতের আঁধারে ঢালাই কাজ করা হয়। যেখানে সিমেন্টের পরিমাণ চোখের দেখায় কম মনে হয়েছে।
কিন্তু গত বৃহস্পতিবার ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মো. ছাদেক প্রধান প্রকৌশলী বরাবর যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তাতে উল্লেখ করেছেন, ভাইরাল নিউজে ‘রডের পরিবর্তে বাঁশ’ এর ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। প্রকৃত পক্ষে, বাঁশ স্লাবের নিচে সাটারিং- এর জন্য রাখা হয়েছিল।
এরই মধ্যে ঢালাইকৃত স্লাবগুলো Random (র্যান্ডম) চেক করে প্রতিটিতে রড পাওয়া গেছে তবে, তা Specification (স্পেসিফিকেশন) অনুযায়ী নয়।
কাজেই এটি প্রতীয়মান হয় যে রডের পরিবর্তে বাঁশ দিয়ে ঢালাই না করলেও তিনি নিম্নমানের কাজ করেছেন। একই সাথে, ঠিকাদারের সাথে এলাকার যুবক/তরুণদের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এবং প্রতিশোধ হিসেবে বিষয়টিকে মুখরোচক এবং অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করা হয়েছে।
ঠিকাদার স্পেসিফিকেশনে Pre-cast Slab (প্রি-কাস্ট স্লাব) থাকা সত্ত্বেও ঠিকা চুক্তি লঙ্ঘন করে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া Cast-in Situ (কাস্ট-ইন সিটু) স্লাব ঢালাই করেছেন যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। Cast-in Situ ঢালাইকৃত স্লাবগুলোও স্পেসিফিকেশন মোতাবেক রড দেওয়া হয়নি ও ঢালাই করা হয়নি। এ পরিপ্রেক্ষিতে এ কাজ সম্পূর্ণ অপসারণসহ ঠিকাদারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ঠিকাদার নিজেই কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কাজ করেছেন বলে তদন্তকারীকে জানিয়েছেন। কাজেই তদারকিতে নিয়োজিত এলজিইডির কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সরাসরি অভিযুক্ত করা সমীচীন হবে না।
তবে, মনিটরিং এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় তাদের শৈথিল্য রয়েছে বলে মনে হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে টাঙ্গাইল, এলজিইডির মনিটরিং সিস্টেম- যেমন নিয়মিত ঠিকাদারের সাথে Management Meeting (ম্যানেজমেন্ট মিটিং), Laboratory test Protocol (ল্যাবরেটরি টেস্ট প্রোটোকল) (Cylinder এর পরিবর্তে প্রতিটি উপাদানের কাজের শেষে Core Cutter test) এবং সিসিটিভি এর মাধ্যমে জেলাপর্যায়ে অনলাইন পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে।
গ্রামীণ সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর (বাসাইল জিসি-কাউলজানী ইউপি ভায়া মাইজখাড়া জিপিএস সড়ক) ৯০ দশমিক শূন্য ৬ মিটার দীর্ঘ এ সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা। মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ নামে একটি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি করছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া কাজটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তবে নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় সময় বাড়ানো হয়।
বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। সম্প্রতি সেতুর ফুটপাতের স্লাব ঢালাইয়ে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।


