লোহিত সাগরে তেলবাহী ট্যাংকার ও বাব আল-মানদেব প্রণালীতে আধিপত্য বিস্তারের পর সৌদি আরবে সামরিক হামলা স্থগিত করতে ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ এবং ইয়েমেনের আনুষ্ঠানিক শাসক হিসেবে স্বীকৃতির শর্ত দিয়েছে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘গালফ নিউজ’ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের টানা কয়েক বছরের বিমান হামলা ও দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই বিপুল অংকের অর্থ দাবি করেছে হুথিরা। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য পরিসংখ্যানে টাকার অংক কিছুটা পরিবর্তন হলেও রিয়াদকে দেওয়া স্পষ্ট বার্তাটি ছিল—যুদ্ধের এই ফাঁদ থেকে বের হতে সৌদি আরবকে বহু কোটি ডলার গুণতে হবে।
এডেনের দিকে এগোচ্ছে হুথিরা
চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে সৌদি তেলের স্থাপনা ও বিমানবন্দরে হুথিদের হামলা এবং তাদের নতুন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে পরিস্থিতি পুনরায় তীব্র রূপ নিয়েছে। ২০১৫ সালের পর এবারই প্রথম হুথিরা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের কেন্দ্রস্থল ‘এডেন’ শহর থেকে মাত্র ৫০ মাইলেরও কম দূরত্বে অবস্থান নিয়েছে।
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডি-এর সিনিয়র মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক আমেনেহ মেহভার জানান, গত অক্টোবরে হুথিরা সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দর ও সৌদি আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে প্রায় প্রতিদিন হামলা চালিয়েছে। শুধু সাম্প্রতিক দিনগুলোতেই সৌদি ভূখণ্ডে অন্তত ২৬টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে ইয়েমেনের শাবওয়াহ গভর্নরটে হুথিদের এক একক হামলায় অন্তত ৭৫ জন নিহত এবং ২০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন, যা ইয়েমেন গৃহযুদ্ধ নতুন করে শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউটের ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিশসেন ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় ক্রমাগত হামলার প্রভাব বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেওয়ায় ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের প্রথম পর্বের সংঘাতের তুলনায় এখন ঝুঁকি বহু গুণ বেড়েছে। কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা এই শত্রুর বিরুদ্ধে সামরিকভাবে সৌদির সামনে খুব কম বিকল্পই উন্মুক্ত রয়েছে।
রিয়াদের দ্বিমুখী সংকট
সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান রণক্ষেত্রে শক্ত ভিত্তি স্থাপন ছাড়া কোনো পূর্ণাঙ্গ আলোচনায় বসতে চাচ্ছেন না। তবে মার্কিন ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, অতিরিক্ত সেনা পাঠানো রক্তক্ষয়ী হতে পারে এবং তা দেশের ভেতরে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে বহু সৈন্য হতাহত হলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মাজেদ আল-মাদহাজী মনে করেন, ৫১ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে সৌদির আসল উদ্বেগ অন্য জায়গায়। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এমন একটি নজির তৈরি হওয়া, যা অনুসরণ করে হুথি গোষ্ঠী অতিরিক্ত অর্থ বা সুবিধা আদায়ের জন্য যখন ইচ্ছা সামরিক সংঘাত বাড়াতে পারবে।
সাবেক মার্কিন সেনাকর্তা কর্নেল ডেভিড ডেস রোচেস জানান, হুথিরা ছোট পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সরাসরি এডেনে হামলা চালাইয় জোট বাহিনীর জন্য সেখানে স্থলসেনা নামানো কঠিন করে তুলেছে। এর ফলে ইরান, ইরাকি শিয়া মিলিশিয়া ও হুথিদের হামলা ঠেকাতে সৌদি আরবকে তাদের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করতে হচ্ছে।
মক্কা চুক্তি ও মিত্রদের ভূমিকা
রিয়াদের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে গত ডিসেম্বরে হুথি বিরোধী অভিযান থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয় সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাধ্য হয়ে সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র দ্বারস্থ হয়, যার মূল কথা হলো—এক দেশে হামলা মানে বাকি দেশগুলোতেও হামলা।
তবে পাকিস্তান ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সরাসরি বিমান হামলায় অংশ নেওয়ার খবর অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে অক্টোবরে মিশরের পার্লামেন্ট ইয়েমেনে সামরিক সহায়তার প্রস্তাব অনুমোদন করলেও প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি স্পষ্ট করেছেন, তাদের যেকোনো মিশন হবে শুধুমাত্র আত্মরক্ষামূলক। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এই যুদ্ধে সরাসরি সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার তুর্কি পার্লামেন্ট ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ অনুমোদনের বিলটির প্রথম অনুচ্ছেদ পাস করেছে।
ইয়েমেনের সরকারি সেনাবাহিনী বুধবার দাবি করেছে, গত ৫ অক্টোবর তাদের ‘ডন অফ ইয়েমেন’ অভিযান শুরুর পর থেকে হুথি অবস্থানের ওপর ১,৩২২টি আক্রমণ চালানো হয়েছে। এতে প্রায় ৩৪০ জন হুথি যোদ্ধা নিহত বা আহত হয়েছে এবং ১১৪টি সামরিক যানবাহন ও সরঞ্জাম ধ্বংস করা হয়েছে। আল-জাওফ ও তাইজ প্রদেশেও অগ্রগতি অর্জনের দাবি করে তারা।
জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ সংঘাত ও লড়াইয়ে ইতোমধ্যে হাজার হাজার মানুষ হতাহত হয়েছেন এবং ২৫ লাখেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন।


