মাসের শেষে বিদ্যুৎ বিল হাতে নিয়ে বসেছেন একজন মধ্যবিত্ত মানুষ। বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে তার আরেকটি হিসাব—লোডশেডিং সামলাতে কেনা আইপিএসের ব্যাটারি, এর রক্ষণাবেক্ষণ ও চার্জিং খরচ। অথচ প্রতিদিন সকালে তার বাড়ির ছাদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদ পড়ে। একসময় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—“আমার ছাদে যখন সূর্য আছে, তখন সেই সূর্য থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করে আমার খরচ কমানো এত কঠিন কেন?”
গত চার বছর ধরে জলবায়ু আন্দোলন, তরুণদের সম্পৃক্ততা ও গ্রাসরুটস ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে এই প্রশ্নটি আমার কাছে শুধু একটি পরিবারের প্রশ্ন মনে হয়নি। এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি ও ক্লাইমেট জাস্টিসের একটি বড় প্রশ্ন। আমরা রিনিউএবল এনার্জির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করছি, রুফটপ সোলারের কথা বলছি, নেট মিটারিং চালু করেছি; কিন্তু বাস্তবে একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার, ছোট ব্যবসায়ী, কৃষক কিংবা তরুণ উদ্যোক্তার জন্য ক্লিন এনার্জি এখনো কতটা সহজ, সাশ্রয়ী ও বাস্তবসম্মত?
বাংলাদেশের নীতিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। রিনিউএবল এনার্জি পলিসি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ রিনিউএবল সোর্স থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ন্যাশনাল রুফটপ সোলার প্রোগ্রাম এবং নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫-এর মাধ্যমে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অগ্রগতিও একেবারে নেই, এমন নয়। ২০২৬ সালের মার্চে এসআরইডিএ জানিয়েছে, দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ ইউটিলিটির নেটওয়ার্কে ৪,৪৯০টির বেশি নেট-মিটারড রুফটপ সোলার সিস্টেম যুক্ত হয়েছে, যার সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ২১৪ মেগাওয়াট। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ের ২০ ও ৩০ শতাংশ লক্ষ্যের পাশে এই চিত্র দেখলে বোঝা যায়—পলিসির গতি ও বাস্তব গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে।
এই ব্যবধানের প্রথম কারণকে আমরা প্রায়ই “সোলার প্যানেলের দাম” বলে ব্যাখ্যা করি। বিষয়টি এত সরল নয়। সোলার পিভির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খরচ নেই বললেই চলে এবং প্রযুক্তির দামও গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিন্তু একটি পরিবারের কাছে অর্থনীতির হিসাব শুধু লাইফটাইম কস্ট দিয়ে হয় না; আজ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কত টাকা আছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক বছরের মধ্যে ইনভেস্টমেন্টের টাকা উঠে আসতে পারে—এই যুক্তি একজন মাসে মাসে সংসার চালানো মানুষের কাছে তখনই কার্যকর, যখন তার হাতে আজ সেই ইনভেস্টমেন্ট করার মতো অর্থ থাকে।
অর্থাৎ সমস্যাটি অনেক সময় টেকনোলজির চেয়ে ফাইন্যান্সিং মডেলের। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, সাসটেইনেবিলিটি-লিংকড ফাইন্যান্স বা ওপেক্স মডেল ব্যবহার করতে পারে। আইডকল বর্তমানে রুফটপ সোলারের জন্য সফট লোন, টেকনিক্যাল সাপোর্ট এবং ক্যাপেক্স ও রেস্কো/ওপেক্স—দুই ধরনের বিজনেস মডেলের সুযোগ দিচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প ব্যয়ের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত টার্ম লোন, ১০ বছর পর্যন্ত মেয়াদ এবং নির্দিষ্ট সুদের হারও রয়েছে।
কিন্তু একজন সাধারণ পরিবারের জন্য একই ধরনের সহজ ফাইন্যান্সিং ব্যবস্থা কোথায়? একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কি জামানত ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদি সোলার লোন পাবেন? একজন কৃষক কি সেচের জন্য সোলার সিস্টেম বসাতে গিয়ে এমন কিস্তি পাবেন, যা তার মৌসুমি আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? এখানেই রিনিউএবল এনার্জির “সাশ্রয়ী” হওয়ার ধারণা এবং মানুষের বাস্তব সামর্থ্যের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।
এই কারণে রুফটপ সোলার এখনো অনেকাংশে মিডল-ক্লাস কিংবা আপার-মিডল-ক্লাস সলিউশন হয়ে থাকার ঝুঁকিতে আছে। নিজের বাড়ি ও ছাদ আছে, আপফ্রন্ট ইনভেস্টমেন্ট করার সামর্থ্য আছে, ব্যাংকিং সুবিধা আছে—এমন গ্রাহক তুলনামূলকভাবে এগিয়ে। কিন্তু ভাড়াটিয়া পরিবার? অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসকারী মানুষ? ছোট দোকান? এমন পরিবার যার বাড়ির ছাদ যৌথ মালিকানাধীন? তাদের জন্য বর্তমান রুফটপ সোলার কাঠামো কতটা উপযোগী—এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
নেট মিটারিং এই জায়গায় একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। নিজের উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়া এবং তার বিপরীতে বিল সমন্বয়ের ধারণাটি মূলত প্রসিউমার—অর্থাৎ একই সঙ্গে ইলেকট্রিসিটি প্রডিউসার ও কনজিউমার—তৈরি করতে পারে। কিন্তু পলিসি থাকা আর তা মানুষের জন্য সহজ হওয়া এক বিষয় নয়।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশের রুফটপ সোলার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আপফ্রন্ট কস্টের পাশাপাশি ব্যুরোক্রেসি, তথ্যের ঘাটতি, আর্থিক প্রণোদনার সীমাবদ্ধতা, স্ট্রাকচারাল ব্যারিয়ার এবং অন্যান্য বাধার কথা উঠে এসেছে। নেট-মিটারিং ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা নিয়েও গবেষণায় ইনস্টলেশন ও পারমিশনের সময়, ইউটিলিটি সাপোর্ট, স্থানীয় দক্ষতা, সিস্টেম কোয়ালিটি এবং কনজিউমার নলেজের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অর্থাৎ একজন মানুষ শুধু প্যানেল কিনতে চান না; তিনি চান একজন নির্ভরযোগ্য ইনস্টলার, সঠিক সিস্টেম সাইজিং, ভালো ইনভার্টার, নিরাপদ ইনস্টলেশন, ওয়ারেন্টি, মেইনটেন্যান্স এবং সহজ গ্রিড কানেকশন। তিনি চান না ছাদে কয়েক লাখ টাকা ইনভেস্ট করার পর কয়েক বছর পর জানতে যে নিম্নমানের ইকুইপমেন্ট ব্যবহারের কারণে সিস্টেমের পারফরম্যান্স কমে গেছে। রিনিউএবল এনার্জিকে তাই শুধু “প্যানেল বসানোর প্রজেক্ট” হিসেবে দেখলে চলবে না।
এটি একটি পূর্ণ ইকোসিস্টেম। ফাইন্যান্সের সঙ্গে টেকনোলজি, টেকনোলজির সঙ্গে গ্রিড, গ্রিডের সঙ্গে স্টোরেজ, স্টোরেজের সঙ্গে ফাইন্যান্সিং; আর সবকিছুর সঙ্গে দক্ষ জনবল, মেইনটেন্যান্স, কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড, কনজিউমার প্রটেকশন এবং কার্যকর পলিসি যুক্ত। এই চেইনের একটি অংশ দুর্বল হলেও পুরো এনার্জি ট্রানজিশন ধীর হয়ে যায়।
গ্রিড ইন্টিগ্রেশন ও স্টোরেজও তাই গুরুত্বপূর্ণ। সূর্য দিনে আলো দেয়, কিন্তু মানুষের বিদ্যুতের প্রয়োজন ২৪ ঘণ্টা। সোলার জেনারেশনের সময় ও ইলেকট্রিসিটি ডিমান্ডের সময় সবসময় এক নয়। ফলে ব্যাটারি স্টোরেজ, ডিমান্ড ম্যানেজমেন্ট এবং আধুনিক ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের উন্নয়ন ছাড়া রুফটপ সোলারের বড় আকারের সম্প্রসারণও সীমাবদ্ধ হতে পারে। বাংলাদেশে এই জায়গায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি স্টোরেজ ফাইন্যান্সিংয়ের বিষয়টিও পলিসির অংশ হওয়া দরকার।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের এনার্জি সিকিউরিটি। বাংলাদেশ এখনো বিদ্যুৎ ও সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহে ফসিল ফুয়েলের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। অয়েল, গ্যাস ও কয়লার আমদানি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করে। তাই রিনিউএবল এনার্জি শুধু কার্বন এমিশন কমানোর প্রজেক্ট নয়। এটি বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমানোর, এনার্জি সিকিউরিটি বাড়ানোর এবং ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও রেজিলিয়েন্ট করার অর্থনৈতিক কৌশল।
এখানেই আসে গ্রিন জবের প্রশ্ন। রিনিউএবল ট্রানজিশন মানে শুধু বিদেশ থেকে সোলার প্যানেল আমদানি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে সিস্টেম ডিজাইন, ইনস্টলেশন, ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্ক, অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স, এনার্জি অডিটিং, ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট, সফটওয়্যার, ফাইন্যান্সিং ও স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরি। বিশ্বব্যাপী রিনিউএবল এনার্জি সেক্টরে ২০২৪ সালের শেষে অন্তত ১৬.৬ মিলিয়ন কর্মসংস্থান ছিল বলে আইরেনা ও আইএলও-এর ২০২৫ সালের অ্যানুয়াল রিভিউ জানিয়েছে। একই প্রতিবেদনে স্কিলস ডেভেলপমেন্টকে রিনিউএবল এনার্জি সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এখানেই একটি বড় সুযোগ। আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে মিছিল করেছি, মানববন্ধন করেছি, সচেতনতা তৈরি করেছি। এখন সময় প্রটেস্ট থেকে পলিসি, অ্যাওয়ারনেস থেকে ইমপ্লিমেন্টেশন এবং অ্যাক্টিভিজম থেকে ক্লাইমেট গভর্ন্যান্সের দিকে যাওয়ার। একজন তরুণ শুধু রিনিউএবল এনার্জির সুবিধাভোগী নয়; সে ইনস্টলার, ইঞ্জিনিয়ার, রিসার্চার, উদ্যোক্তা কিংবা পলিসি স্টেকহোল্ডারও হতে পারে।
চট্টগ্রামের দিকে তাকালেও বিষয়টি স্পষ্ট। বন্দর, শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্যিক ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় দিনের বেলায় বড় বিদ্যুৎ চাহিদা থাকে। এসব ভবনের উপযুক্ত ছাদকে যদি নিরাপদ ও মানসম্মত রুফটপ সোলারের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই আংশিকভাবে করা সম্ভব। চট্টগ্রামে রুফটপ সোলারের প্রসার তাই শুধু ক্লাইমেট অ্যাকশন নয়—এটি নগর এনার্জি ম্যানেজমেন্টেরও অংশ হতে পারে।
তাহলে করণীয় কী?
প্রথমত, রুফটপ সোলারকে সাধারণ ব্যাংকঋণের পণ্য না বানিয়ে “এনার্জি-অ্যাজ-আ-সার্ভিস” ধরনের সহজ ফাইন্যান্সিং মডেল চালু করতে হবে। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, আইডকল ও বেসরকারি ব্যাংক মিলে স্বল্পসুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে পারে, যেখানে রিপেমেন্ট হবে সাশ্রয় হওয়া বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। এতে আপফ্রন্ট কস্ট কমবে এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার প্রবেশাধিকার বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, ক্যাপেক্সের পাশাপাশি ওপেক্স বা পে-অ্যাজ-ইউ-গো মডেল বাড়াতে হবে। এখানে গ্রাহককে শুরুতেই পুরো সিস্টেম কিনতে হবে না; তৃতীয় পক্ষ সিস্টেম স্থাপন ও পরিচালনা করবে, আর গ্রাহক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সেবা কিনবেন। আইডকলের বিদ্যমান রেস্কো/ওপেক্স কাঠামোকে ছোট গ্রাহক ও এসএমইদের জন্য আরও উপযোগী করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য ব্ল্যাঙ্কেট সাবসিডি নয়, টার্গেটেড সাবসিডি প্রয়োজন। দরিদ্র পরিবার, ক্ষুদ্র কৃষক, ক্লাইমেট-ভালনারেবল কমিউনিটি এবং মাইক্রো-এন্টারপ্রাইজের জন্য আংশিক ক্যাপিটাল সাবসিডি বা ইন্টারেস্ট সাপোর্ট দেওয়া যেতে পারে।
চতুর্থত, ভাড়াটিয়া ও অ্যাপার্টমেন্টবাসীকে বাইরে রেখে রুফটপ সোলার বিপ্লব সম্ভব নয়। কমিউনিটি সোলার বা শেয়ার্ড সোলার মডেল চালু করা যেতে পারে—একটি ভবন, বাজার, স্কুল বা কমিউনিটি ছাদে সোলার সিস্টেম স্থাপন করে একাধিক গ্রাহকের বিলের সঙ্গে উৎপাদিত বিদ্যুতের সুবিধা সমন্বয় করা। এর জন্য নেট মিটারিংয়ের পাশাপাশি ভার্চুয়াল বা শেয়ার্ড সেটেলমেন্টের মতো কাঠামো নিয়ে নীতিগতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, স্কুল, মাদ্রাসা, কমিউনিটি সেন্টার, সরকারি অফিসসহ বিভিন্ন পাবলিক বিল্ডিংকে ডেমোনস্ট্রেশন সাইট বানানো যেতে পারে। এতে একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সাশ্রয়, পাবলিক অ্যাওয়ারনেস এবং স্থানীয় দক্ষতা তৈরি হবে। প্রতিটি প্রজেক্টের সঙ্গে স্থানীয় যুবকদের ইনস্টলেশন ও মেইনটেন্যান্স ট্রেনিং যুক্ত করা হলে একটি কার্যকর গ্রিন-স্কিলস ইকোসিস্টেম গড়ে উঠতে পারে।
সবশেষে, রুফটপ সোলারের সঙ্গে এনার্জি এফিশিয়েন্সিকে একই পলিসির অংশ করতে হবে। একটি অদক্ষ ভবনে যত সোলার প্যানেলই বসানো হোক, বিদ্যুতের অপচয় কমানো না গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। দক্ষ ফ্যান, এসি, লাইটিং, ইনসুলেশন ও এনার্জি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে সোলার যুক্ত করলে একই ইনভেস্টমেন্টে বেশি সাশ্রয় পাওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশ রিনিউএবল এনার্জির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে—এটি আশাব্যঞ্জক। কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের আসল পরীক্ষা হবে মেগাওয়াটের সংখ্যায় নয়, মানুষের জীবনে। একজন কৃষক যদি সহজ কিস্তিতে সোলার ইরিগেশন নিতে পারেন, একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যদি নির্ভরযোগ্য ফাইন্যান্সিংয়ে রুফটপ সোলার বসাতে পারেন, একজন ভাড়াটিয়াও যদি শেয়ার্ড সোলারের সুবিধা পান, একজন তরুণ যদি সোলার ইনস্টলেশন করে আয় করতে পারেন—তখনই রিনিউএবল ট্রানজিশন সত্যিকার অর্থে গণমুখী হবে।
ক্লাইমেট জাস্টিসের মূল কথাটিও এখানেই। যারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী, তারা যেন ক্লিন এনার্জি ট্রানজিশনের সুবিধা থেকেও সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত না হন। রিনিউএবল এনার্জি যদি শুধু বড় কারখানা, করপোরেট ভবন ও সামর্থ্যবান পরিবারের প্রযুক্তি হয়ে থাকে, তাহলে আমরা একটি গ্রিন ট্রানজিশন করব ঠিকই, কিন্তু একটি জাস্ট ট্রানজিশন করব না।
বাংলাদেশের আকাশে সূর্যের অভাব নেই। অভাব এমন একটি ব্যবস্থার, যা সেই সূর্যের আলোকে মানুষের বিনিয়োগের সামর্থ্য, মালিকানার অধিকার কিংবা ব্যাংকঋণের যোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল না করে মানুষের নাগালের বিদ্যুতে পরিণত করতে পারে।
আমাদের পরবর্তী রিনিউএবল এনার্জি লক্ষ্য শুধু কত মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন হলো—তা নয়; বরং কতজন সাধারণ মানুষ বলতে পারল, “এই বিদ্যুৎ আমারও।”
লেখক:
ক্লাইমেট অ্যাক্টিভিস্ট, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।

