ধানখেতে পড়ে ছিল ১৫ বছরের কিশোরী জান্নাতুল তাজমিনের নিথর দেহ। যে বয়সে তার স্কুলের বেঞ্চে বসে পড়ার কথা, বন্ধুদের সাথে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনার কথা, সেই বয়সেই ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় এক অটোরিকশাচালককে গ্রেপ্তার করা হয়। যে জীবনটি সবে কৈশোরের দরজা পেরোচ্ছিল, তা থেমে গেল এক সহিংস ঘটনায়।
তাজমিনের মৃত্যু একা কোনো পরিবারের শোক নয়; এটি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেখানে একটি শিশুর বেঁচে থাকা, নিরাপদে বেড়ে ওঠা এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার অধিকার নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে মাগুরায় আট বছরের এক শিশুর ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। চলতি বছরেও শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রতিটি ঘটনার পর প্রতিবাদ হয়েছে, বিচারের দাবি উঠেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। কিন্তু সেই আলোড়ন স্তিমিত হলে শিশুদের সুরক্ষায় কী বদলায়?
একটি মেয়ে নির্যাতনের শিকার হওয়ার আগেই তাকে রক্ষা করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? অপরাধের পর তার চিকিৎসা, মানসিক পুনর্বাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র কতটা দায়িত্ব পালন করে? আর সমাজের ভূমিকা কি কেবল ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? বিশ্ব কন্যা দিবসে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। কারণ, একটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু তার পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব, সমাজের দায় এবং মানবিকতার পরীক্ষা।
ছয় বছরে ৩ হাজার ৪৮৭ শিশু ধর্ষণের শিকার
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩ হাজার ৪৮৭ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে সংগঠনটি মোট ধর্ষণের ৬ হাজার ১৫৩টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। অর্থাৎ, সংগঠনটির নথিভুক্ত ধর্ষণের ঘটনাগুলোর অর্ধেকেরও বেশি শিশুদের ঘিরে।
এইচআরএসএসের বছরভিত্তিক হিসাবে, ২০২১ সালে ১ হাজার ৪৭ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭৩২, ২০২৩ সালে ৫৫৮, ২০২৪ সালে ২৮৪, ২০২৫ সালে ৪৭৪ এবং ২০২৬ সালে প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত ৩৯২। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর ১৩১ শিশুকে হত্যার ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি। এ ছাড়া ছয় বছরে শিশুদের যৌন হয়রানির ১ হাজার ২৫৫টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
সংগঠনটির হিসাবে, শিশুদের যৌন হয়রানির ঘটনা ২০২১ সালে ছিল ২৩৫টি, ২০২২ সালে ২৫২, ২০২৩ সালে ২২৬, ২০২৪ সালে ১৩০, ২০২৫ সালে ২৩৬ এবং ২০২৬ সালে প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত ২৭৬টি।
এই সংখ্যাগুলো কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি গণনা নয়। এইচআরএসএস সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এসব তথ্য প্রকাশ করেছে। ফলে সংবাদে না আসা বা সংগঠনের নজরে না পড়া ঘটনা এতে অন্তর্ভুক্ত না-ও হতে পারে। অন্যদিকে, বিভিন্ন বছরের তথ্য সংগ্রহের সময়সীমা ও পদ্ধতির পার্থক্যও বিবেচনায় রাখা জরুরি। তারপরও এসব পরিসংখ্যান একটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে আনে- শিশুদের সুরক্ষায় বিদ্যমান আইন, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও কেন বারবার এমন ঘটনা ঘটছে?
চলতি বছরের ছয় মাসেই ধর্ষণের শিকার ২৩৮ শিশু ও কিশোরী
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। এইচআরএসএসের জানুয়ারি-জুন ২০২৬-এর অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময়ে দেশে ৪০৪ নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৩৮ জন শিশু ও কিশোরী। একই সময়ে ৮৮ নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জনকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৬২১ নারী ও কন্যাশিশু। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪২। অর্থাৎ, সংগঠনটির নথিভুক্ত হিসাবে এক বছরে নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ।
এইচআরএসএসের তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৫ জুলাই ২০২৬-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনেও এ চিত্র উঠে এসেছে। তবে নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই প্রকৃত অপরাধের হার একই অনুপাতে বেড়েছে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অভিযোগ জানানোর প্রবণতা, সংবাদমাধ্যমের নজরদারি এবং তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিও এসব সংখ্যাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে নিয়মিত, নির্ভরযোগ্য ও তুলনাযোগ্য সরকারি তথ্য প্রয়োজন।
সংখ্যার আড়ালে থাকা বাস্তবতাটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি শিশুর নিরাপত্তাবোধ, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্ক, পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহিংসতার শারীরিক ক্ষত সেরে উঠলেও মানসিক আঘাত থেকে যায় দীর্ঘদিন।
কন্যাশিশুর নিরাপত্তায় বৈশ্বিক চিত্র
শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক মানবাধিকার সংকট। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের ২০২৪ সালের বৈশ্বিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, বর্তমানে জীবিত ৩৭ কোটিরও বেশি মেয়ে ও নারী ১৮ বছর বয়সের আগে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ, বিশ্বজুড়ে প্রতি আটজন মেয়ে ও নারীর প্রায় একজন শৈশবে এ ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। অনলাইন ও মৌখিক নির্যাতনের মতো স্পর্শবিহীন যৌন সহিংসতাও হিসাবে ধরলে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬৫ কোটি, অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনে একজন।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, শৈশবে যৌন সহিংসতার শিকার মেয়েদের সংখ্যার দিক থেকে সাব-সাহারান আফ্রিকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল। এ ছাড়া মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক শিশু এ ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে। যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও সামাজিক অস্থিরতার পরিস্থিতিতে শিশুদের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
যৌন সহিংসতার প্রভাব শুধু শারীরিক ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক বিকাশেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আবার সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। ফলে প্রকৃত চিত্র পরিসংখ্যানে পুরোপুরি উঠে আসে না।
এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে, কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; রাষ্ট্র ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। কার্যকর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগীর চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা এবং নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশ্বজুড়ে এই সংকটের ব্যাপকতা বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা- কন্যাশিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ।
‘ব্যবস্থার ব্যর্থতা’ কোথায়?
মাগুরায় শিশুধর্ষণের ঘটনার পর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ শবনাজ জাহেরীন। সম্প্রতি এক আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, মাগুরার ১১ বছর বয়সী শিশুটির ঘটনায় সুরক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়েছে।
তার বিশ্লেষণে, পরিবারে সচেতনতার ঘাটতি, কার্যকরভাবে কাজ না করা কমিউনিটিভিত্তিক শিশু কল্যাণ ব্যবস্থা এবং শিশু সুরক্ষায় সমাজকর্মীদের সীমিত দায়িত্ব- এসবই গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা।
তিনি আরও বলেন, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের দায়িত্ব কেবল পুলিশ বা আদালতের নয়। পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে ঝুঁকিতে থাকা শিশুকে আগেভাগে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একই আলোচনায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক মোস্তফা মোস্তাকুর রহিম খান জানান, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিশু কল্যাণ বোর্ডগুলোর কার্যক্রমে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ওপর বিপুলসংখ্যক কমিটি ও কর্মসূচির দায়িত্ব থাকায় শিশু সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ইউনিয়ন পর্যায়ে বিশেষায়িত শিশু সুরক্ষা সমাজকর্মী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
অপরাধের পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব কতটা?
শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ঘটলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা কিংবা মামলা গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জরুরি চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া, আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় তাকে পুনরায় মানসিক আঘাতের মুখে না ফেলা- সবই সুরক্ষাব্যবস্থার অংশ।
২০২৬ সালের ২২ মে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা বন্ধে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি শিশু ও নারীদের সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং প্রতিরোধ, অভিযোগ গ্রহণ, শিশুবান্ধব পুলিশি কার্যক্রম, বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক সেবার ঘাটতি দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন।
রানা ফ্লাওয়ার্স আরও বলেন, সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়া শিশুদের মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। তাদের ছবি, ভিডিও কিংবা পরিচয় প্রকাশ করে এমন তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের ওপর নতুন করে আঘাত তৈরি করতে পারে। শিশুদের সুরক্ষায় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের দায়িত্বশীল আচরণের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
ইউনিসেফের এই বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অপরাধের পর দ্রুত গ্রেফতার বা বিচারের ঘোষণা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কার্যকর প্রতিরোধ, প্রশিক্ষিত তদন্তকারী, দ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বিচারিক সক্ষমতা এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা।
বাস্তবে এসব সেবা কতটা সহজলভ্য, তা মূল্যায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যও প্রয়োজন। অভিযোগ জানানোর পর কত দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, কতটি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে, কতটি অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে এবং কতটি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে- এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা সহজ হবে।
বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও ভুক্তভোগীর অধিকার
শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার গতি গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতে বিলম্ব, তদন্তে দক্ষতার ঘাটতি, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের সমস্যা কিংবা আদালতে মামলার জট- যেকোনো একটি পর্যায় দীর্ঘ হলে ন্যায়বিচার পেতে ভুক্তভোগী পরিবারকে দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে পড়তে হতে পারে।
একই আলোচনায় আইন ও বিচার বিভাগের যুগ্মসচিব ও জেলা জজ আবুল হাসানাত বলেছিলেন, আইন ও কাঠামো থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগে দুর্বলতা রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি- মামলার সংখ্যা, অভিযোগপত্র, বিচারাধীন মামলা এবং দণ্ডাদেশ এক বিষয় নয়। একটি নির্দিষ্ট সময়ের ধর্ষণের অভিযোগের সঙ্গে একই সময়ের দণ্ডাদেশের সংখ্যা সরাসরি তুলনা করে বিচারব্যবস্থার সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। মামলাগুলোর অগ্রগতি, ঘটনার সময়, তদন্তের অবস্থা ও বিচারিক নিষ্পত্তির তথ্য একসাথে বিশ্লেষণ করতে হবে।
তবু বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে তার প্রভাব ভুক্তভোগী শিশুর ওপর পড়ে। বারবার ঘটনার বিবরণ দিতে হওয়া, সামাজিক চাপ, অভিযুক্তের পক্ষ থেকে ভয়ভীতি কিংবা গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা শিশুটির মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তাই শিশুবান্ধব সাক্ষ্যগ্রহণ, পরিচয় সুরক্ষা, আইনি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
অপরাধের ক্ষত শুধু শরীরে থাকে না
যৌন সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়া শিশুর জন্য শারীরিক চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার মানসিক পুনর্বাসনও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে। ভয়, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সংকট- এসব প্রতিক্রিয়া শিশুভেদে ভিন্ন হতে পারে। যথাসময়ে উপযুক্ত সহায়তা না পেলে তার দৈনন্দিন জীবন ও সম্পর্কের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে।
জাতীয় ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টারের প্রধান ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ইসমত জাহান সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শিশুদের ধর্ষণের ঘটনার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন আঞ্চলিক কেন্দ্রেও এমন ঘটনার শিকার শিশুর সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। তিনি বিষণ্নতা, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) এবং আত্মহানির প্রবণতার মতো দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি শিশুকে চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠানোই পুনর্বাসনের শেষ ধাপ নয়। তার নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা, পড়াশোনায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ এবং সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। সেই সহায়তা যেন পরিবারটির আর্থিক সামর্থ্য বা অবস্থানের ওপর নির্ভর না করে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
সমাজের দায় কি কেবল প্রতিবাদে শেষ?
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক মনোভাবও শিশুদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যৌন সহিংসতার ঘটনায় ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা, তার পোশাক বা চলাফেরা নিয়ে প্রশ্ন তোলা, কিংবা পরিবারের সম্মানের কথা বলে অভিযোগ গোপন রাখার চাপ- এসব আচরণ শিশুটির ওপর নতুন করে মানসিক বোঝা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আইন সহায়তা সম্পাদক রেখা সাহা এক আলোচনায় বলেন, যৌন সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়া একজন শিশুর জন্য বিচ্ছিন্নভাবে আইনি, চিকিৎসা বা মানসিক সহায়তা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত সুরক্ষাব্যবস্থা। অর্থাৎ, ভুক্তভোগীকে একদিকে চিকিৎসা, অন্যদিকে আইনি সহায়তা এবং আলাদা করে মানসিক পুনর্বাসনের জন্য ছুটতে বাধ্য না করে, সেবাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করতে হবে।
পরিবারের দায়িত্ব শিশুকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সে বিপদে পড়লে নির্ভয়ে কথা বলতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বয়সোপযোগী নিরাপত্তা শিক্ষা, সম্মতি সম্পর্কে সচেতনতা, বিশ্বাসযোগ্য প্রাপ্তবয়স্কের কাছে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে জ্ঞানও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, তবে শিশুদের সচেতন করার পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের আচরণ, অপরাধীর জবাবদিহি এবং সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাও সমান গুরুত্বে দেখতে হবে। শিশুকে একা নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে দিলে রাষ্ট্র ও সমাজের দায় আড়াল হয়ে যায়।
সংবাদমাধ্যমেরও দায় আছে
শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনা প্রকাশ্যে আনা জনস্বার্থে জরুরি। তবে সংবাদ পরিবেশনের ধরন যেন ভুক্তভোগীর জন্য নতুন বিপদ তৈরি না করে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্ষণের ঘটনার ক্ষেত্রে শিশুর নাম, ছবি, বাড়ির ঠিকানা, স্কুল কিংবা এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়। ঘটনার বিবরণে অপ্রয়োজনীয় যৌন বা শারীরিক বর্ণনা এড়িয়ে চলতে হবে। একইভাবে, অপরাধের দায় ভুক্তভোগীর পোশাক, চলাফেরা কিংবা আচরণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সও শিশুদের ছবি, ভিডিও ও পরিচয় প্রকাশকারী তথ্য ছড়িয়ে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ, একটি সংবাদ প্রতিবেদন অপরাধের বিচার দাবি করতে পারে; আবার অসতর্ক উপস্থাপন একই শিশুকে সামাজিক কলঙ্ক, হয়রানি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপের মুখেও ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকতার দায়িত্ব শুধু অপরাধের খবর জানানো নয়, বরং ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষা করে রাষ্ট্র ও সমাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ জরুরি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব কন্যা দিবস কেবল মেয়েদের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও অর্জন উদ্যাপনের দিন নয়; তাদের অধিকার বাস্তবে কতটা সুরক্ষিত, তা পর্যালোচনারও উপলক্ষ। বাংলাদেশের কন্যাশিশুরা যেন নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারে, নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারে এবং সহিংসতার শিকার হলে ন্যায়বিচার পায়- এটাই হওয়া উচিত দিবসটির মূল অঙ্গীকার।
এ জন্য প্রয়োজন কয়েকটি সমন্বিত পদক্ষেপ: ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করতে কার্যকর স্থানীয় সুরক্ষাব্যবস্থা, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও সহজ পথ, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, শিশুবান্ধব বিচারপ্রক্রিয়া, বিনা বাধায় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাজের জবাবদিহি। পাশাপাশি, ভুক্তভোগীর পরিচয় সুরক্ষা ও সামাজিকভাবে তাকে গ্রহণ করার পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, কুমিল্লার তাজমিনের মৃত্যু কিংবা অন্য শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাগুলোকে কেবল কয়েক দিনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখলে পরিবর্তন আসবে না। প্রতিটি ঘটনার পর তদন্তের অগ্রগতি, বিচারপ্রক্রিয়ার অবস্থা এবং সুরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। প্রতিরোধের উদ্যোগগুলো বাস্তবে কাজ করছে কি না, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো পরিবারের একার দায়িত্ব নয়। এটি রাষ্ট্রের আইনগত দায়িত্ব, সমাজের নৈতিক দায় এবং প্রতিটি নাগরিকের মানবিক কর্তব্য। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরীক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা সফল- তার উত্তর দিবসের বক্তৃতায় নয়, বরং প্রতিটি শিশুর বাস্তব জীবনে পাওয়া সুরক্ষা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের মধ্যেই প্রতিফলিত হবে।

