জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর উত্তরায় মীর মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঢাকা-১৮ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ হাবিব হাসানসহ ২৬ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একইসাথে সূচনা বক্তব্যসহ সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৪ নভেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।
রবিবার (১১ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মামলায় গ্রেফতার থাকা আট আসামির উপস্থিতিতে এদিন অভিযোগ দুটি বাংলায় পড়ে শোনান বিচারপতি নজরুল ইসলাম। অভিযোগ পড়া শেষে কাঠগড়ায় থাকা আসামিদের দোষী নাকি নির্দোষ জিজ্ঞেস করা হয়। এ সময় নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ট্রাইব্যুনালের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন তারা। পরে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনসহ সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য তারিখ নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, মার্জিনা রায়হান, তারেক আবদুল্লাহ, মঈনুল করিম, সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর উপস্থিত ছিলেন। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী সুলতান মাহমুদ, আবুল হাসানসহ স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীরা।
এদিন সকালে গ্রেফতার আটজনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন- ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মির্জা সালাহউদ্দিন, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক ওসি মো. মজিবুর রহমান, আজমপুর পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক কনস্টেবল মো. হোসেন আলী, উত্তরা পশ্চিম থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনোয়ার ইসলাম চৌধুরী রবিন, যুবলীগ সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন রুবেল, আওয়ামী লীগ নেতা মো. সোহেল রানা, ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি মো. শাহ আলম ও তুরাগ থানা এলাকার আওয়ামী লীগ কর্মী মো. ইরফানুল হক গাজী।
সাবেক সাংসদ হাবিব হাসানসহ পলাতক অন্যরা হলেন- সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির উত্তরা বিভাগের সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার কাজী আশরাফুল আজীম, উত্তরা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. তোহিদুল ইসলাম, উত্তরা বিভাগের সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার সুমন কর, উত্তরা পশ্চিম থানার সাবেক ওসি বিএম ফরমান আলী, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশনস) মাহমুদুল হাসান, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক কনস্টেবল মো. আবু ছায়েম, আওয়ামী লীগ নেতা মো. আলাউদ্দিন আল সোহেল, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর হোসেন, সাবেক কাউন্সিলর মো. ফরিদ আহমেদ, সাবেক কাউন্সিলর ডিএম. শামীম, সাবেক কাউন্সিলর মো. আনিছুর রহমান নাঈম, সাবেক কাউন্সিলর মো. আফছার উদ্দিন খান, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক এসআই খালেদ আনোয়ার, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক এএসআই মো. রোকনুজ্জামান, উত্তরা পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মুরতাফা বিন ওমর ও তুরাগ থানা আওয়ামী লীগের যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন।
প্রসিকিউশন জানায়, গত ২৩ সেপ্টেম্বর মামলাটিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ দেওয়ার জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ অসুস্থ থাকায় তারিখ পিছিয়ে আজকের দিন ঠিক করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ফরমাল চার্জ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৪ নভেম্বর দিন ধার্য করেন আদালত।
প্রসিকিউশনের প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকা মহানগরের উত্তরা এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও আশপাশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) এমবিএ শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ সাতজনকে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে উবারচালক মোখলেছুর রহমান ওরফে দুর্জয়কে পুলিশের এপিসির চাকায় পিষ্ট করে হত্যার পর মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। একই ঘটনায় মেহেদী হাসানসহ পাঁচজনকে হত্যাচেষ্টার উদ্দেশ্যে গুলি করে গুরুতর জখম করার অভিযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযোগে, ১৯ জুলাই একই এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর পুনরায় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে রিদোয়ান শরীফ রিয়াদ জয়সহ চারজনকে হত্যা করা হয়। এছাড়া রাইসুল রহমান রাতুলকে হত্যাচেষ্টার উদ্দেশ্যে গুলি করে গুরুতর আহত করা হয়। দুটি অভিযোগেই এসব ঘটনাকে পরিকল্পিত, ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে প্রসিকিউশন।

