দেশের বাজারে গরুর মাংসের দাম প্রতি কেজি ২৫০ টাকায় নামিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এ লক্ষ্যে জীবিত গরু ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সনদপ্রাপ্ত প্যাকেটজাত হালাল মাংস আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আমদানি শুল্ক যৌক্তিকীকরণের দাবি জানানো হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট করার কথা জানিয়েছেন নোটিশদাতা আইনজীবী।
রবিবার (১১ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন জনস্বার্থে এ নোটিশ পাঠান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে নোটিশের প্রাপক করা হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উচ্চমূল্যের কারণে দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের জন্য গরুর মাংস কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে তাদের প্রাণিজ আমিষ গ্রহণের সক্ষমতার ওপর।
আমদানির মাধ্যমে দাম কমানোর যুক্তি
নোটিশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ‘তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্ব’ তুলে ধরে বলা হয়েছে, যেসব দেশে কোনো পণ্য তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন করা সম্ভব, সেসব দেশ থেকে আমদানি করলে ভোক্তারা কম দামে পণ্যটি পেতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। নোটিশে বলা হয়, শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি করে। একইভাবে, কম উৎপাদন ব্যয়ের দেশগুলো থেকে গরুর মাংস আমদানির সুযোগ দিলে বাংলাদেশের বাজারেও দাম কমতে পারে।
নোটিশে আরও বলা হয়, দেশে চারণভূমির সীমাবদ্ধতা, পশুখাদ্যের উচ্চমূল্য এবং গবাদিপশু পালনের সামগ্রিক ব্যয়ের কারণে মাংস উৎপাদনে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, কিছু দেশে বিস্তৃত চারণভূমি ও বৃহৎ পরিসরে পশু পালনের সুযোগ থাকায় তুলনামূলক কম খরচে গরু ও মাংস উৎপাদন করা সম্ভব।
আইনজীবীর দাবি, এসব দেশ থেকে বাণিজ্যিকভাবে গরু ও মাংস আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে। এতে গরুর মাংসের দাম প্রতি কেজি ২৫০ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে দাবি
নোটিশে সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, খাদ্যসহ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একইসাথে ১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।
এ ছাড়া সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জীবনের অধিকারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে নোটিশে বলা হয়েছে, মানুষের জীবনধারণের অধিকারের সাথে পুষ্টিকর খাদ্যপ্রাপ্তির বিষয়টিও সম্পর্কিত।
নোটিশে অভিযোগ করা হয়েছে, আমদানির সুযোগ সীমিত থাকায় বাজারে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে ভোক্তাদের উচ্চমূল্যে গরুর মাংস কিনতে হচ্ছে।
১৫ দিনের সময়সীমা, না হলে হাইকোর্টে রিট
নোটিশে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে জীবিত গরু এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সনদপ্রাপ্ত হালাল ফ্রোজেন বা চিল্ড মাংস আমদানির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আমদানি শুল্ক যৌক্তিকীকরণ এবং গরুর মাংসের দাম প্রতি কেজি ২৫০ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট পিটিশন (পিআইএল) দায়ের করা হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আমদানি ব্যয়, শুল্ক, পরিবহন ও সংরক্ষণ খরচসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় গরুর মাংসের দাম প্রতি কেজি ২৫০ টাকায় নামিয়ে আনার দাবিটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বাজার পরিস্থিতির ওপর।


