...|...|...

জাতীয়

মারণাস্ত্র নয়, কূটনীতিই হোক বিশ্ব পরিবর্তনের হাতিয়ার: প্রধানমন্ত্রী

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ভোর রাত ৫:১৯ | আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:০৭
Shares
মারণাস্ত্র নয়, কূটনীতিই হোক বিশ্ব পরিবর্তনের হাতিয়ার: প্রধানমন্ত্রী

ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধ ও সংঘাতের পথ পরিহার করে আলোচনা, কূটনীতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিশ্বে পরিবর্তনের হাতিয়ার হওয়া উচিত মারণাস্ত্র নয়; বরং যুক্তি, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবিকতা।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া ভাষণে এ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘের এই মঞ্চে এটাই ছিল তাঁর প্রথম ভাষণ। তিনি বাংলায় বক্তব্য দেন।

ভাষণের শুরুতে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানান তারেক রহমান। পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতিও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে নতুন যাত্রা শুরু করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, জনগণই দেশের সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।

জাতিসংঘের একই মঞ্চে তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বক্তব্য দেওয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তারেক রহমান। বাংলাদেশের জনগণ ও দেশের স্বার্থে তাঁরাও এই মঞ্চে কথা বলেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং নতুন নতুন মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে। এর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ও মূল্যস্ফীতির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিও চাপের মধ্যে পড়ছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বাংলাদেশের প্রত্যাশা, জাতিসংঘ এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যেখানে প্রতিটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে এবং মতপার্থক্য সমঝোতার মাধ্যমে নিরসন করা হবে।

ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপ হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বছরের পর বছর আশ্রয় দিতে হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে তাদের নিজ মাতৃভূমিতে ফেরত পাঠানোই এ সংকটের সমাধানের পথ। এ প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর সহযোগিতা চান তিনি। প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বানও জানান।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কথাও জাতিসংঘের মঞ্চে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তা বাড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

জলবায়ু মোকাবিলায় বাংলাদেশের নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পাশাপাশি প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পানি সংরক্ষণ ও মজুদের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগ এবং তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকায়নের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নের প্রসঙ্গে তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্যোক্তা ও গবেষকদের জন্য সুযোগ তৈরির পাশাপাশি নতুন উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার বিকাশে সরকারি সহায়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

নারীর ক্ষমতায়নকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে নারীশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তারেক রহমান। স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি।

দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘ফার্মার্স কার্ড’, ‘স্পোর্টস কার্ড’ ও ‘ই-হেলথ কার্ড’-এর মতো উদ্যোগের কথা জানান। ভবিষ্যতে এসব কর্মসূচিকে সমন্বিত করে একটি সার্বজনীন কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

শিক্ষা ও ক্রীড়াক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও ভাষণে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের স্কুল ব্যাগ, ইউনিফর্ম ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগ এবং শিক্ষাক্রমে খেলাধুলাকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত জুনে আয়োজিত মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয়।

প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি ও নতুন প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে বিশ্ব নতুন এক যুগে প্রবেশ করছে। তবে প্রযুক্তির সুবিধা যেন নতুন বৈষম্য তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানের ডিজিটাল বিভাজন ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভাজনে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তারের সুফল নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, এই পরিবর্তনকে টেকসই করতে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশেষ করে অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।