কর্মব্যস্ততা, পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা নানা ব্যক্তিগত কারণে মানসিক চাপে ভোগেন অনেকেই। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ঘুম, মনোযোগ, মেজাজ ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে জীবনযাপনের পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবারেও কিছু পরিবর্তন এনে মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা পাওয়া যায়।
স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘এভরিডে হেলথ’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুষ্টিকর খাবার মস্তিষ্কের কার্যক্রম ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ভিটামিন বি এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়।
এ ছাড়া অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বা গাট মাইক্রোবায়োমের সাথে মস্তিষ্কের যোগাযোগ রয়েছে। ফলে খাদ্যাভ্যাস পরিপাকতন্ত্রের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, মানসিক চাপ মোকাবিলায় সহায়ক ১০টি খাবার সম্পর্কে।
১. গ্রিন টি ও ভেষজ চা
এক কাপ গরম চা অনেকের কাছে মানসিক প্রশান্তির একটি সহজ উপায়। ক্যামোমাইল ও ল্যাভেন্ডারের মতো ভেষজ চা শরীর ও মনকে শিথিল করতে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে গ্রিন টি-তে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফ্ল্যাভোনয়েড, যা মস্তিষ্কের কোষের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।
গ্রিন টি-তে কফির তুলনায় ক্যাফেইন কম থাকে। তাই অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলতে চাইলে এটি ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীল ব্যক্তিদের পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা উচিত।
২. ডার্ক চকোলেট
মন খারাপ হলে অল্প ডার্ক চকোলেট খেতে ভালো লাগে অনেকের। এতে থাকা কোকো ফ্ল্যাভানল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের জন্য উপকারী। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ কোকোযুক্ত ডার্ক চকোলেট গ্রহণ মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু জৈবিক সূচকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বেশি চিনি ও ক্যালরির কারণে অতিরিক্ত চকোলেট খাওয়া ঠিক নয়। ৭০ শতাংশ বা তার বেশি কোকোযুক্ত ডার্ক চকোলেট অল্প পরিমাণে খেতে পারেন।
৩. লাল চাল ও অন্যান্য গোটা শস্য
লাল চাল, ওটস, ব্রাউন রাইস ও হোল গ্রেইন রুটিতে রয়েছে জটিল শর্করা, খাদ্য আঁশ, ভিটামিন ও খনিজ। এসব খাবার ধীরে হজম হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
শর্করা মস্তিষ্কে সেরোটোনিন তৈরির প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। সেরোটোনিন মেজাজ ও ঘুম নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি রাসায়নিক বার্তাবাহক। তাই পরিশোধিত শর্করার পরিবর্তে গোটা শস্য বেছে নেওয়া ভালো।
৪. অ্যাভোকাডো
অ্যাভোকাডোতে রয়েছে স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত চর্বি, খাদ্য আঁশ, পটাশিয়াম ও বিভিন্ন ভিটামিন। এসব পুষ্টি উপাদান হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে।
এতে থাকা স্বাস্থ্যকর চর্বি সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে উপকারী। পাশাপাশি খাদ্য আঁশ অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্যও সহায়ক। ফলে সামগ্রিক শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে অ্যাভোকাডো খাওয়া যেতে পারে।
৫. সামুদ্রিক ও চর্বিযুক্ত মাছ
সালমন, সার্ডিন, ম্যাকারেল, হেরিং ও টুনার মতো মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠন ও কার্যক্রমে এই ফ্যাটি অ্যাসিড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিভিন্ন গবেষণায় ওমেগা-৩ গ্রহণের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বিষণ্নতার কিছু উপসর্গের ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণা চলছে। যারা মাছ খান না, তাঁরা আখরোট, তিসি ও চিয়া বীজ থেকে উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ পেতে পারেন।
৬. এক গ্লাস দুধ
রাতে ঘুমানোর আগে হালকা গরম দুধ পান করার অভ্যাস অনেকের রয়েছে। দুধে থাকা প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান শরীরের জন্য উপকারী।
ক্যালসিয়াম স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি দুধে থাকা ট্রিপটোফ্যান ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু রাসায়নিক তৈরির প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। তাই ঘুমের আগে দুধ পান অনেকের কাছে আরামদায়ক অভ্যাস হতে পারে।
৭. বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার
কাঠবাদাম, আখরোট, পেস্তা, কুমড়ার বীজ ও সূর্যমুখীর বীজে রয়েছে ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, ভিটামিন বি ও স্বাস্থ্যকর চর্বি।
ম্যাগনেসিয়াম স্নায়ুতন্ত্র ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে বাদামে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।
প্রতিদিন অল্প পরিমাণ বাদাম ও বীজ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। তবে অতিরিক্ত লবণযুক্ত বা চিনিমিশ্রিত বাদাম এড়িয়ে চলা ভালো।
৮. কমলা, লেবু ও স্ট্রবেরি
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও কোষের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। কমলা, মাল্টা, পেয়ারা, লেবু ও স্ট্রবেরিতে প্রচুর ভিটামিন সি রয়েছে।
মানসিক চাপের সময় শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়তে পারে। ভিটামিন সি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে। তাই প্রতিদিনের খাবারে এসব ফল রাখা ভালো।
৯. প্রোবায়োটিকযুক্ত খাবার
মানুষের অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে স্নায়বিক ও রাসায়নিক যোগাযোগ রয়েছে। এ কারণে অন্ত্রের স্বাস্থ্য মানসিক সুস্থতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
টক দই, কেফির ও অন্যান্য ফার্মেন্টেড খাবারে উপকারী অণুজীব থাকতে পারে। এসব খাবার অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। কিছু গবেষণায় নির্দিষ্ট প্রোবায়োটিকের সঙ্গে উদ্বেগ ও মানসিক চাপের উপসর্গ কমার সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে সব প্রোবায়োটিকের প্রভাব এক নয়।
১০. আঁশযুক্ত শাকসবজি ও ডাল
শিম, মটরশুঁটি, ব্রকলি, গাজর, বিভিন্ন শাক ও ফলমূল খাদ্য আঁশের ভালো উৎস। এসব খাবার হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে গেলে দুর্বলতা, বিরক্তি ও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। আঁশযুক্ত খাবার শর্করা শোষণের গতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। পাশাপাশি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবেও কাজ করে।
মানসিক চাপ কমাতে খাবারের পাশাপাশি যা জরুরি
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।নিয়মিত হাঁটা ও শরীরচর্চা করুন।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- অতিরিক্ত চা-কফি ও ক্যাফেইন গ্রহণ কমান।
- কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নিন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটান।


