...|...|...

বিশ্ব

ভারতে সংঘর্ষে নিহত ৯

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১:৫৭
Shares
ভারতে সংঘর্ষে নিহত ৯

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের সংঘাতকবলিত রাজ্য মণিপুরে নতুন করে জ্বলে ওঠা নাগা-কুকি জাতিগত সংঘাতে গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। কামজং, কাংপোকপি ও উখরুল—এই তিন জেলায় ছড়িয়ে পড়া রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় প্রাণহানির এই ঘটনা ঘটে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম প্রাণঘাতী দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এদিকে এই সহিংসতার মধ্যেই মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচান্দ সিং দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সাক্ষাৎকালে তিনি রাজ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের অটল প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

হিন্দুস্তান টাইমসের বরাতে কর্মকর্তা ও স্থানীয় গ্রামবাসীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ছয়জন নাগা সম্প্রদায়ের, দুজন কুকি এবং একজন নেপালি বংশোদ্ভূত ব্যক্তি রয়েছেন। কামজং এবং কাংপোকপি জেলায় চারজন করে এবং উখরুল জেলায় একজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় রাজ্যজুড়ে নতুন করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে এবং পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

মণিপুর মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানানো হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা এবং আজকের সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন... পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে এবং শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

কামজং জেলায় যেমন করে ছড়াল সহিংসতা

নাগা-প্রধান কামজং জেলার চাসাদ পুলিশ স্টেশনের কাছে নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যকার ক্রসফায়ারে ৪২ বছর বয়সী এক কুকি নারী নিহত হওয়ার পর মূলত এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়।

কর্মকর্তারা জানান, রাজ্য পুলিশ, ইন্ডিয়ান রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন (আইআরবি) এবং সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী (বিএসএফ) যৌথভাবে চাসাদ পুলিশ স্টেশনের কাছাকাছি এলাকায় অবৈধ বাঙ্কার ধ্বংস করার জন্য একটি অভিযান চালায়। ওই সময় স্থানীয় নারীদের একটি দল অভিযান ব্যাহত করার চেষ্টা করে। কর্মকর্তারা তাদের বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলে অজ্ঞাত হামলাকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে, যার জবাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও পাল্টা গুলি চালায়।

এই সংঘর্ষের সময় পাঁচ সন্তানের জননী ডোমখোনেই টৌথাং গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এদিকে কুকি নারীদের সংগঠন ‘কুকি উইমেন্স ইউনিয়ন’ দাবি করেছে যে, ২৩ বছর বয়সী মাইকেল এনগামমিনলেন হাউকিপ নামের এক কুকি যুবকও গুলিতে নিহত হয়েছেন। অপর এক কর্মকর্তা নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে উভয় সম্প্রদায়ের অন্তত ১৪টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। পরদিন শনিবার সকালে প্রথম দফার সংঘর্ষের স্থান থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে নিনচৌ চিংডং গ্রামে দুজন নাগা গ্রাম পাহারাদারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন ৩০ বছর বয়সী এনগানচসো নিংশেন এবং ৫০ বছর বয়সী লিশিশান হুংও। একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত পার হয়ে আসা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী এই হামলায় জড়িত থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি এবং তদন্ত চলছে।

কাংপোকপিতে হামলা ও অ্যাম্বুশ প্রতিবেশী

কাংপোকপি জেলায় গত শনিবার ভোর ৫টার দিকে মাকুই গ্রামে আরেকটি হামলায় তিনজন নাগা গ্রামরক্ষী নিহত হয়েছেন। কুকি-জো অধ্যুষিত এই জেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগা জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। নিহতরা হলেন—মাচুঙ্গামামগ, আজিনপৌ রিংকাংমাই এবং রবার্ট।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নিহতদের একজনের দেহ বিকৃত বা ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, একদল পুরুষ রাইফেল হাতে নিয়ে এক পাহারাদারের বিকৃত মরদেহের চারপাশে ঘুরছে। তবে ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ স্বাধীনভাবে এই ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

এর প্রায় এক ঘণ্টা পর, মাকুই গ্রামকে সহায়তার উদ্দেশ্যে তাপোন থেকে মাকুইয়ের দিকে যাওয়া নাগা গ্রাম স্বেচ্ছাসেবকদের লক্ষ্য করে তপোনের কাছে ওঁৎ পেতে থাকা সন্দেহভাজন কুকি জঙ্গিরা অতর্কিতে হামলা (অ্যাম্বুশ) চালায়। তাপোন থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ঘটা এই হামলায় থালন গ্রামের ৩৫ বছর বয়সী মাচুংওয়াংবাউ নিহত হন এবং অপর দুজন স্বেচ্ছাসেবী আহত হন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গ্রামটি অজ্ঞাত সশস্ত্র ব্যক্তিদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে—এমন খবর পেয়ে স্বেচ্ছাসেবকরা মাকুইয়ের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। পথিমধ্যে ওত পেতে থাকা সন্দেহভাজন কুকি জঙ্গিরা তাদের ওপর হামলা চালায়। আহত স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্ধার করে সেনাপতি জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ওই এলাকায় রক্তক্ষয়ী বন্দুকযুদ্ধ অব্যাহত ছিল বলে জানা গেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে কুকি সংগঠন ‘কমিটি অন ট্রাইবাল ইউনিটি’ কাংপোকপি জেলায় শনিবার থেকে ২৪ ঘণ্টার সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট বা শাটডাউন ঘোষণা করেছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বেসামরিক নাগরিকদের মুখোমুখি হওয়া মারাত্মক নিরাপত্তা হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে এটি একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। কোটু সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি শান্ত থাকার, সংযত হওয়ার এবং পরিস্থিতি আরও অবনতি করতে পারে এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে।

উখরুলে নেপালি নাগরিক নিহত

আরেকটি পৃথক ঘটনায়, শনিবার সকালে উখরুল জেলার কোংজাং গ্রামে অজ্ঞাত সশস্ত্র হামলাকারীদের অতর্কিত গুলিতে এক পথচারী নিহত হয়েছেন। পুলিশ জানায়, ইম্ফলকে উখরুলের মাধ্যমে নাগাল্যান্ডের সঙ্গে সংযোগকারী জাতীয় মহাসড়ক ২০২-এর ওপর লিটান পুলিশ স্টেশন থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সকাল সাড়ে ৫টার দিকে এই ঘটনা ঘটে।

হামলার উদ্দেশ্য ও জড়িতদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। নিহত ব্যক্তির নাম সন্দীপ রাই (৩০)। তিনি নেপালি বংশোদ্ভূত এবং নিজের কারে চড়ে যাওয়ার সময় হামলাকারীরা তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায়। লিটান পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে একটি মামলা দায়ের করেছে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের মে মাসে সংখ্যাগুরু মেইতেই এবং উপজাতি কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতিগত সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকেই মণিপুর অশান্ত রয়েছে। এই দীর্ঘ সংঘাতে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি ঘটেছে, বিভিন্ন এলাকায় জাতিগত বিভাজন তৈরি হয়েছে এবং প্রায় ৩২০ জনের প্রাণহানি ও ৬৬,০০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

সংঘাতের শুরুতে নাগা সম্প্রদায় সরাসরি এতে জড়িত না থাকলেও, গত বছরের ১৩ মে কাংপোকপি জেলায় জোড়া হামলায় তিন গির্জার নেতাসহ চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর তারাও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। একই দিনে কুকি ও নাগা উভয় সম্প্রদায়ের ৪৮ জন বেসামরিক নাগরিককে জিম্মি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ আন্দোলন ও প্রতিবাদের পর নাগা সংগঠনগুলো গত বছরের ৯ জুন ১৪ জন কুকি জিম্মিকে মুক্তি দেয়। তবে ১০ জুন ছয়জন নাগা জিম্মির ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও চরম আকার ধারণ করে।