...|...|...

জাতীয়

টাইম ম্যাগাজিনের বিশেষ প্রতিবেদন

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১০:৩৩ | আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩:০৫
Shares
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প

ছবি: সংগৃহীত

গ্লোবাল এনার্জি ক্রাইসিস বা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের জেরে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক আয়ের প্রধান স্তম্ভ পোশাক শিল্প। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন সংঘাতের জেরে আমদানীকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা দেশকে এক গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে। 

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সংবাদমাধ্যম ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার উত্তরায় আশুলিয়ায় অবস্থিত হামিম গ্রুপ-এর পোশাক কারখানায় প্রতিদিন হাজার হাজার পোশাক তৈরি হচ্ছে। গ্যাাপ, আমেরিকান ঈগল ও জেসিপেনি-র মতো বিশ্বখ্যাত ব্রান্ডের কাজ করা এই কারখানায় প্রায় ৯০,০০০ কর্মী প্রতি মাসে ১ কোটি বা তার বেশি পোশাক সামগ্রী উৎপাদন করেন। কিন্তু গ্রিড বিদ্যুতের ঘন ঘন বিভ্রাট এবং গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কারখানাগুলোকে সচল রাখতে ব্রিটিশ আমলের বিশাল ডিজেল জেনারেটরগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

সংকটে থাকা এ দেশের অর্থনীতি ৫১০ বিলিয়ন ডলারের, যা দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম। তবে ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ আমদানীকৃত জ্বালানির ভঙ্গুরতাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৫% এবং ডিজেলের দাম প্রায় ৭০% বেড়েছে। আর ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর স্পট এলএনজি-র দাম প্রায় তিনগুণ হয়ে গেছে।

চার মিলিয়ন বা ৪০ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এবং গত বছর ৩৮.৭ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় (দেশের মোট রফতানির ৮০ শতাংশের বেশি) এনে দেওয়া পোশাক শিল্পের জন্য এই জ্বালানি সংকট বড় ধরনের অশনিসংকেত। শুধু হামিম গ্রুপ একাই ১ বিলিয়ন ডলারের রফতানি করেছে।

গ্লোবাল সাউথজুড়ে জ্বালানি খরা

বাংলাদেশের পাশাপাশি ফিলিপাইন, নাইজেরিয়া, তানজানিয়া ও ইথিওপিয়ার মতো গ্লোবাল সাউথভুক্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোও আমদানীকৃত জ্বালানি সংকটে জর্জরিত। ফিলিপাইনে চার দিন কাজের সপ্তাহ এবং ফ্লাইট বাতিলের মতো জরুরি পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। নাইজেরিয়ায় ডিজেলের দাম ৮৬% এবং তানজানিয়া ও ইথিওপিয়ায় ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষিকাজ, পরিবহন ও খাদ্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল সতর্ক করে বলেছেন, দরিদ্রতম মানুষগুলোই এর শিকার হবে সবচেয়ে বেশি।

অন্ধকার রাজধানী ও নাগরিক ভোগান্তি

প্রায় চার কোটির মেগাসিটি ঢাকায় জাতীয় গ্রিডে ৩,০০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে ব্যাপক লোডশেডিং চলছে। হাসপাতাল ও জরুরি সেবা বাদে বাকি সব জায়গায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে। রাতের বেলা আলোকসজ্জা ও বিলবোর্ড বন্ধ রাখতে হচ্ছে এবং দোকানপাট এক ঘণ্টা আগেই বন্ধ করা হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। গ্যাসের চাপ না থাকায় ভোরের আগেই রান্নার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে নারীদের। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ব্যবসায়িক মন্দার কারণে দেশের ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারেন।

অভ্যন্তরীণ ও ভূরাজনৈতিক জটিলতা

দেশের ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের জ্বালানি চাহিদার প্রায় অর্ধেকই মেটানো হয় মধ্যপ্রাচ্যের আমদানির মাধ্যমে। তবে হরমুজ প্রণালীর সংঘাত এবং ফ্লোটিং টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের কারণে জুলাই-আগস্ট মাসে এলএনজি আমদানি ৮৩% কমে গেছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের জন্য জ্বালানি সংকট বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, গত ১৫ বছরের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ভারত থেকে তার প্রয়োজনের একষষ্ঠাংশ বিদ্যুৎ আমদানি করে, যা অনেক সময় কৌশলগত চাপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

রুশ সহায়তায় রূপপুরে নির্মিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ($১২.৬৫ বিলিয়ন বিনিয়োগ) ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে নানা জটিলতা ও অর্থপ্রদান সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিল। গত ১১ অক্টোবর প্রথম নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকশন সম্পন্ন হলেও ডিসেম্বরে চালুর আগে আরও মাসব্যাপী পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই ঋণ পরিশোধ এবং পারমাণবিক জ্বালানি আমদানির জন্য ওয়াশিংটনের বিশেষ ছাড় প্রয়োজন হতে পারে।

ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের দ্বিমুখী সমীকরণ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তির পাশাপাশি বেইজিংয়ের সাথেও সম্পর্ক জোরদার করছে ঢাকা। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ ১৭টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া চীন সরকারের সাথে তৃতীয় একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

জ্বালানি স্বাধীনতা অর্জনে সরকার ছাদভিত্তিক সোলার বা সৌরবিদ্যুতের আমদানিতে শুল্ক ১৭% থেকে কমিয়ে ১%-এ নামিয়ে এনেছে। প্রথম ছয় মাসে গ্রিডে ২০০ মেগাওয়াট সোলার যুক্ত হয়েছে। তবে ২৪ ঘণ্টা সচল থাকা বড় পোশাক কারখানাগুলোর জন্য ছাদের সোলার কেবল দিনের সামান্য সময়েই কার্যকর।

উৎপাদনশীলতায় কঠোর নজরদারি

ছোট চার শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টিকে থাকা বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজের চাপ বেড়েছে। হামিম গ্রুপের জ্বালানি বিল প্রতিদিন ২ লাখ থেকে বেড়ে ৩ লাখ ডলারে দাঁড়ালেও ক্রেতারা পণ্যের দাম বাড়াতে রাজি নন। ফলে দক্ষ জনবল ও কর্মঘণ্টার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আশা প্রকাশ করেছেন যে, গত মাসে প্রকাশিত নতুন এনার্জি রোডম্যাপ ও নতুন গ্যাস কূপ খননের ফলে আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে বিদ্যুতের এই সংকট কেটে যাবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবসহ বিভিন্ন তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ ও হুথি হামলার কারণে আপাতত স্বস্তির কোনো লক্ষণ দেখছেন না দেশটির ব্যবসায়ীরা। ফাতুল্লাহ অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজল মঈন ইহসান বলেন, বর্তমান সরকারের জন্য পরিস্থিতি খুবই কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যে যদি যুদ্ধ না থাকত, তবে অনেক ভালো হতো।