জাপানে রাজনীতির গতিপ্রকৃতি ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রেক্ষাপটে স্থায়ীভাবে বসবাসের নীতি কঠোর করতে যাচ্ছে জাপান সরকার। এর ফলে দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত অনেক প্রবাসী বিদেশি নাগরিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কাজের সুবাদে জাপানে আসার প্রায় আট বছর পর জন্মভূমি বাংলাদেশের চেয়ে পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতেই নিজের জীবন অনেক বেশি মানানসই বলে মনে করেন আব্দুল (ছদ্মনাম)। উত্তর টোকিওতে বাংলাদেশি স্ত্রীর সাথে বসবাসকারী এই টেক ইঞ্জিনিয়ার আল জাজিরাকে বলেন, জাপান সরকার ভবিষ্যতে কী করবে বা তারা নিয়ম আরও কড়া করবে কি না, তা আমি জানি না।
স্থায়ী বসবাস এবং নাগরিকত্ব—উভয়ের জন্যই আবেদন করার প্রস্তুতি নেওয়া আব্দুল আশঙ্কা করছেন যে তাকে হয়তো শিগগিরই দেশ ছাড়তে হতে পারে। তিনি বলেন, আমার উভয় আবেদনই যদি প্রত্যাখ্যাত হয়, তবে আমাকে তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই মুহূর্তে আমি জাপানের বাইরে অন্য কোনো সুযোগ খুঁজছি।
আগামী ১ অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের দেখাতে হবে যে তাদের বার্ষিক গৃহস্থালি আয় জাপানি গড় আয়ের চেয়ে বেশি—যা গত এপ্রিল থেকে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর ক্ষেত্রেও পূর্ববর্তীভাবে প্রযোজ্য হবে। এছাড়া পর্যাপ্ত জাপানি ভাষা দক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। পাশাপাশি আবেদনকারীদের ৩০ বছরের পেআউটের সমপরিমাণ পেনশনের সঞ্চয় থাকতে হবে।
পরিবর্তনগুলোর বিস্তারিত ঘোষণায় জাপানের ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস এজেন্সি এই ওপর জোর দিয়েছে যে বিদেশি নাগরিকদের অবশ্যই স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে হবে এবং বোঝা হয়ে ওঠার ঝুঁকি ছাড়াই একটি স্থিতিশীল জীবন নিশ্চিত করতে হবে।
দীর্ঘদিনের প্রবাসীদের শঙ্কা ও নাগরিকত্ব ত্যাগের বাধ্যবাধকতা
গত ১৪ বছর ধরে জাপানে বসবাসকারী আমেরিকান নাগরিক সারাহ নেলকিনও এমন অনেক দীর্ঘমেয়াদী বাসিন্দাদের একজন, যিনি নতুন নিয়মের অধীনে যোগ্য না হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। জাপানি অ্যানিমেশন ও ভিডিও গেমের অনুরাগী নেলকিন প্রথমে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে জাপানে আসেন এবং পরবর্তীতে দেশটির বিনোদন শিল্পে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন। নিয়ম পরিবর্তনের ঘোষণা আসার ঠিক আগেই তিনি স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন জমা দিয়েছিলেন। যদি তার আবেদন নাকচ হয়ে যায়, তবে তিনি জাপানের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার পরিকল্পনা করেছেন। তবে এর অর্থ হবে তার মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করা, কারণ জাপান দ্বৈত জাতীয়তা স্বীকার করে না।
নেলকিন বলেন, আমি আমার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের পুরোটা জাপানে কাটিয়েছি... আমি আমার আমেরিকান পাসপোর্ট হারাতে চাই না। আমার মা আমেরিকায় থাকেন এবং পরিবারে সাথে দেখা করার মতো বিভিন্ন কারণে আমি আমার নাগরিকত্ব রাখতে চাই। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমাকে হয়তো আমার আমেরিকান জাতীয়তা ছেড়ে দিতে হতে পারে।
মেকাই ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক রিসা হাগিওয়ারা বলেন, এই পরিবর্তনগুলো এমন একটি নির্বাচনী ও শর্তসাপেক্ষ অভিবাসন নীতির প্রতিফলন, যা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা হ্রাসের মুখে জাপানের শ্রমের চাহিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, শ্রম সংকটের কারণে জাপানের বিদেশি কর্মী প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী বসতি স্থাপনের শর্তগুলো যদি উল্লেখযোগ্যভাবে কঠিন হয়ে ওঠে, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদী জীবন গড়ার কথা বিবেচনা করছেন এমন বিদেশি কর্মীদের কাছে জাপানের আকর্ষণ কমিয়ে দিতে পারে।
অভিবাসন নিয়ে উত্তপ্ত রাজনীতি ও জনমত
ঐতিহাসিকভাবে একক জাতির দেশ জাপানে অভিবাসন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য বা ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশগুলোর তুলনায়—যেখানে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাসিন্দা দেশের বাইরে জন্ম নেওয়া—জাপানের বিদেশি স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশ কম। তবে তা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালের শেষের দিকে রেকর্ড ৪.১২ মিলিয়নে (মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ) পৌঁছেছে। কিছু জরিপ অনুযায়ী, ২০৭০ সালের মধ্যে জাপানের জন্মসূত্রে বিদেশি জনসংখ্যা ওইসিডি এর গড় ১০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
এদিকে, সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দেশের সর্বনিম্ন জন্মহারের কারণে ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে জাপানি নাগরিকদের সংখ্যা ৯ লাখেরও বেশি কমে গেছে। অধ্যাপক হাগিওয়ারা বলেন, জাপানি সমাজে বিদেশি বাসিন্দারা যখন ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, ঠিক তখন দেশটি একটি যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
জাপানের এই প্রস্তাবিত অভিবাসন রদবদল দেশটির রাজনীতির বৃহত্তর দক্ষিণপন্থী পরিবর্তনের মাধ্যমেই ঘটছে। গত বছর রক্ষণশীল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্ব দেওয়ার সময় প্রচারাভিযানের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছিলেন, দেশের উচিত কমপক্ষে এখনকার মতো হলেও সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতি ও পটভূমির লোকেদের প্রবেশের অনুমতি দেয় এমন নীতিগুলো পুনর্বিবেচনা করা। পরবর্তীতে উগ্র-ডানপন্থী জাপান ইনোভেশন পার্টি-এর সাথে তাকাইচির জোট চুক্তি অনুযায়ী নিয়ম ভঙ্গকারী বিদেশিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার এবং বর্ধিত অভিবাসী জনসংখ্যার কারণে সম্ভাব্য সামাজিক ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
একই সাথে উগ্র-ডানপন্থী ও অভিবাসনবিরোধী ‘সানসেইটো’ পার্টি তাদের জাপান ফার্স্ট বার্তার মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এবং সাম্প্রতিক নিম্নকক্ষ নির্বাচনে রেকর্ড ১৫টি আসন জিতে তৃতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
সাধারণ মানুষের মনোভাবও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে চলে গেছে। ইউনিভার্সিটি অব টোকিওর ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৬.৩ শতাংশ জাপানি মানুষ আরও বেশি বিদেশি গ্রহণ করার বিরোধিতা করেছেন, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩৫.৬ শতাংশ।
আব্দুল ও নেলকিন দুজনেই এই মানসিকতার পরিবর্তন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। আব্দুল বলেন, ২০২৪ সালের আগে আমি বিদেশিদের প্রতি কখনও কোনো বৈষম্য অনুভব করিনি, কিন্তু সম্প্রতি একটি পরিবর্তন এসেছে... বিশেষ করে অনলাইনে। নেলকিন জানান, তার সহকর্মীরাও বিদেশিদের প্রতি তাদের অপছন্দের কথা এখন খোলামেলা প্রকাশ করছেন। তিনি বলেন, এমনকি আপাতদৃষ্টিতে ভদ্র মানুষরাও বর্ণবাদী কথা বলছে। আমি এই দেশের জন্য কাজ করেছি এবং সুনির্দিষ্টভাবে কোনো নিয়ম ভাঙা থেকে বিরত থেকেছি, আর তারা বলছে যে আপনি কখনোই যথেষ্ট নন। এটি মেনে নেওয়া সত্যিই খুব কঠিন।


