জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সংকট ও কৃষি খাতে বিপর্যয়ের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সম্ভাব্য এই বাস্তুচ্যুতির পরিমাণ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রকাশিত ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্ক অন দ্য রাইজ-অ্যাকশনস ফর আ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, গ্রিনহাউস গ্যাসের উচ্চ নিঃসরণের বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ উপকূলীয় প্লাবনের শিকার হতে পারে।
এডিবির তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্লাবনঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর বসবাস উপকূলীয় এলাকায়। বিশ্বজুড়ে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি বছর উপকূলীয় বন্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছাতে পারে। ২১০০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১০ কোটি ৮০ লাখে।
বিশেষ করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপসহ এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ বৃহৎ নদী অববাহিকাগুলোতে এই ঝুঁকি বেশি কেন্দ্রীভূত রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো উন্নয়নশীল দেশে উপকূলীয় প্লাবনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য ও বঞ্চনার চক্র আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
উপযুক্ত অভিযোজন ও সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপকূলীয় বন্যায় বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতি ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ছয় গুণ এবং ২১০০ সাল নাগাদ প্রায় ২০ গুণ বেড়ে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩০টি উপকূলীয় অর্থনীতির ওপর পরিচালিত সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বর্তমানে এ অঞ্চলে প্লাবনজনিত বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে এ ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে ১৭২ বিলিয়ন থেকে ১৯৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। ২১০০ সাল নাগাদ তা ৫২০ বিলিয়ন থেকে ৭৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
তবে উপকূলীয় সুরক্ষায় নিয়মিত বিনিয়োগের মাধ্যমে এই ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান পর্যায়ে বন্যাজনিত ক্ষতি ধরে রাখতে প্রতি বছর উপকূলীয় সুরক্ষায় ৯ বিলিয়ন থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ বিনিয়োগের ফলে বছরে ১৭৮ বিলিয়ন থেকে ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ বিনিয়োগের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০ গুণ পর্যন্ত সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের উদ্যোগগুলোর প্রশংসাও করেছে এডিবি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগাম সতর্কবার্তা প্রদান ও সমন্বিত দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদারে বাংলাদেশ দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। দুর্যোগের সময় উপকূলীয় মানুষের জীবন রক্ষায় এসব আশ্রয়কেন্দ্র কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
তবে ভবিষ্যতের জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এডিবির সদস্য দেশগুলোর ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ সমুদ্র উপকূলের মাত্র ১০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করেন। এসব এলাকা বিপুল জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর, বাণিজ্যিক কেন্দ্র, পর্যটনস্থল ও বিশ্ব ঐতিহ্যের ধারক।
ব্যাংকক, জাকার্তা, কলকাতা ও মুম্বাইয়ের মতো বড় শহরও উপকূলীয় বন্যার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব শহরে অতীতে যে ধরনের ভয়াবহ উপকূলীয় বন্যা ১০০ বছরে একবার ঘটত, শতাব্দীর শেষ নাগাদ তা প্রতিবছর ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া বন্দরগুলোতে বাণিজ্য স্থবিরতা ও অন্যান্য বিঘ্নের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৪০ বিলিয়ন থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ও বাণিজ্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, উচ্চ কার্বন নিঃসরণের পরিস্থিতিতে ২১০০ সাল নাগাদ ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর বার্ষিক বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
এডিবির ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের মহাপরিচালক ইয়েভগেনি জুকোভ বলেছেন, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র উপকূলীয় এলাকাগুলো। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এসব এলাকার ভূখণ্ড ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উপযোগী ও ঝুঁকিমুক্ত সমাধান গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিবেদনে সরকারগুলোর প্রতি জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি উপকূলীয় সুরক্ষা অবকাঠামো, প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


