নিয়মিত পড়াশোনা, অধ্যবসায় আর পরিবারের অনুপ্রেরণা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা ও নিজের প্রতি বিশ্বাস। সব মিলিয়ে দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের অর্জন হিসেবে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদকের জন্য মনোনীত হয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ শিক্ষার্থী। তাদের কারও কাছে এই স্বীকৃতি পরিবারের ত্যাগের প্রতিদান, কারও কাছে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের স্বীকৃতি। আবার কারও কাছে এটি ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু করার দায়িত্ব।
স্বর্ণপদকপ্রাপ্তির খবরে আনন্দিত শিক্ষার্থীরা তাদের এই অর্জনের পেছনে মা-বাবা, শিক্ষক ও প্রিয়জনদের অবদানের কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি পড়াশোনার অভিজ্ঞতা, প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে চলা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন তারা। তাদের সাফল্যের গল্পই শুনেছেন টাইমস টুডের নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ইকবাল মাহমুদ।
বাবার স্মৃতিতে স্বর্ণপদক উৎসর্গ মইনুলের
স্বর্ণপদক পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মো. মইনুল আলম জানান, এই সম্মাননা অর্জনের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এটি শুধু তার একার অর্জন নয়, বরং তার বাবা-মা, শিক্ষক, বিভাগ এবং প্রিয় বিদ্যাপীঠ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন।
মইনুল তার এই পদক উৎসর্গ করেছেন প্রয়াত বাবাকে। ২০০২ সালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাবা মারা যান। পাশাপাশি মা ও ছোটবোন জেবিনের ত্যাগ, অনুপ্রেরণা ও সমর্থনের কথাও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেছেন তিনি।
নিজের সাফল্যের পেছনে নিয়মিত পড়াশোনা ও ক্লাসে মনোযোগ দেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মইনুল। তার মতে, পরীক্ষার আগে প্রস্তুতি নেওয়ার চেয়ে নিয়মিত ক্লাসের পড়া বুঝে পড়ার অভ্যাস বেশি কার্যকর। স্বর্ণপদক পাওয়ার কথা ভেবে নয়, নিজের জায়গা থেকে ভালো করার চেষ্টা করেই তিনি এগিয়ে গেছেন।
শিক্ষাজীবনের অর্জন কর্মজীবনে দায়িত্ব বাড়িয়েছে তানিয়ার
আইন ও বিচার বিভাগের তানিয়া আক্তারের কাছে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক শিক্ষাজীবনের একটি বিশেষ অর্জন। তিনি মনে করেন, এই সম্মানের পেছনে মা-বাবার ত্যাগ ও ভালোবাসা, পরিবারের অনুপ্রেরণা এবং শিক্ষকদের দিকনির্দেশনার বড় ভূমিকা রয়েছে।
তানিয়া জানান, স্বর্ণপদক অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি পড়াশোনা করেননি। তবে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই একাডেমিক পড়াশোনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। সময়ের সঠিক ব্যবহার, নিয়মিত পরিশ্রম ও শিক্ষকদের পরামর্শ তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। এলএলএম পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ঈশাখাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর আইন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে সিভিল জজ বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান তিনি।
তানিয়ার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান ও কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সততা, নিরপেক্ষতা, নিষ্ঠা ও মানবিকতার সাথে বিচারিক দায়িত্ব পালন করাই এখন তার অন্যতম লক্ষ্য। তার বিশ্বাস, একটি পদক সাফল্যের শেষ নয়; বরং আরও বড় দায়িত্ব পালনের অনুপ্রেরণা।
প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় রেজার
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মো. নাজমুল করিম রেজার কাছে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ২০২০-এর তালিকায় নিজের নাম দেখা ছিল আনন্দের মুহূর্ত। তবে এই অর্জনের পথ সহজ ছিল না।
রেজা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতে ময়মনসিংহ থেকে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রতিদিন বাসের সংকট মোকাবিলা করতে হতো। পরে ক্যাম্পাসের পাশে মেসে উঠলেও আবাসনসংকটের মুখে পড়তে হয়েছে। এর পাশাপাশি ছিল একাডেমিক পড়াশোনার চাপ, ল্যাব ও শ্রেণিকক্ষের সীমাবদ্ধতা। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষকদের শাসন ও দিকনির্দেশনা তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে বলে জানান তিনি। নিজের এই অর্জন মা-বাবা ও শিক্ষকদের উৎসর্গ করেছেন রেজা।
ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে তিনি জানান, বিভাগের শিক্ষার্থীদের সুযোগ বাড়াতে ল্যাব ও শ্রেণিকক্ষের সীমাবদ্ধতা দূর করার পাশাপাশি দ্রুত এমএসসি প্রোগ্রাম চালু করা প্রয়োজন। অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সততা ও নিষ্ঠার সাথে দেশের মানুষের সেবা করতে চান তিনি।
পড়াশোনা ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্যে নিশাতের সাফল্য
সংগীত বিভাগের নিশাত নিগার নিশির কাছে স্বর্ণপদক পাওয়ার খবরটি এসেছে দীর্ঘ সময় পর। ২০২২ সালে তুরস্কে বৃত্তি নিয়ে পড়তে যাওয়ার আগে তিনি স্বর্ণপদকের জন্য আবেদন করেছিলেন। পরে কয়েক দফায় খবর এলেও শেষ পর্যন্ত এবার নির্বাচিত হওয়ার সংবাদ পান তিনি। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় প্রথমবারের মতো খবর পাওয়ার সেই উত্তেজনা এবার আর অনুভব করেননি বলে জানান নিশাত।
ছোটবেলা থেকেই গানের সাথে তার সম্পর্ক। পরিবারের সদস্যদের গান গাওয়ার অভ্যাস ও উৎসাহে মাত্র তিন-চার বছর বয়সে গানের স্কুলে ভর্তি হন তিনি। সংগীত নিয়ে পড়ার পরিকল্পনা শুরুতে না থাকলেও ধীরে ধীরে এ বিষয়েই এগিয়ে যান।
নিজের পড়াশোনার অভিজ্ঞতা জানিয়ে নিশাত জানান, তিনি কখনো সারাদিন পড়াশোনার মধ্যে থাকতেন না। পড়াশোনার পাশাপাশি বন্ধুদের সাথে আড্ডা, ঘোরাঘুরি, মাঠে বসে গান গাওয়া, গান শেখানো ও টিউশনি করতেন। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যক্তিজীবন ও স্মৃতিগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছেন।
কঠিন সময় এলেও নিজের চেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকা মানুষের কথা ভেবে তিনি সাহস পেতেন। তার সাফল্যের পেছনে মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন নিশাত। খারাপ ফল হলে মা-বাবা তাকে বকাঝকা না করে সাহস ও ভরসা দিয়েছেন। শিক্ষক, বন্ধু ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সহযোগিতাও তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
বর্তমানে তুরস্কে বৃত্তি নিয়ে সংগীতে স্নাতকোত্তর করছেন নিশাত। পড়াশোনার পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরিও করছেন। বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে পরিচিত হওয়া ও নতুন সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার অভিজ্ঞতা তার জীবনকে সমৃদ্ধ করছে বলে জানান তিনি।
বাবার মৃত্যুর পর বড় বোনের ত্যাগে এগিয়ে যান অন্তর
চারুকলা বিভাগের অন্তর পালের কাছে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও সংগ্রামের স্বীকৃতি। তিনি মনে করেন, পরম করুণাময় ঈশ্বরের আশীর্বাদ, পরিবারের সহযোগিতা, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং প্রিয়জনদের ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণায় এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার কাছে স্বর্ণপদক পাওয়া জীবনের অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের মুহূর্ত।
অন্তর জানান, তার এই পথচলা সহজ ছিল না। বাবাকে হারানোর পর একসময় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছিলেন তিনি। তবে বড় বোনের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছেন। নিজের এই অর্জনের পেছনে বড় বোনের অবদানকে অপরিসীম বলে মনে করেন তিনি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সহপাঠী, পরিবারের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন অন্তর।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে অন্তর জানান, অর্জিত জ্ঞান অন্যদের সাথে ভাগ করে নিতে ভালোবাসেন তিনি। বর্তমানে ছোট ছোট শিশুদের চারুকলা ও ছবি আঁকা শেখানোর সাথে যুক্ত আছেন। ভবিষ্যতেও শিক্ষকতা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশে অবদান রাখতে চান তিনি। অন্তরের মতে, এই স্বর্ণপদক শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে পরিবারের ত্যাগ, শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা এবং অনেক মানুষের ভালোবাসা। ভবিষ্যতেও নিষ্ঠার সাথে এগিয়ে গিয়ে সমাজের জন্য ইতিবাচক কিছু করতে চান তিনি।
ধারাবাহিক প্রস্তুতিই ছিল আতিউরের কৌশল
প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদককে দীর্ঘ পথচলার স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন মো. আতিউর রহমান। তার মতে, এই অর্জনের পেছনে বাবা-মায়ের ত্যাগ ও দোয়া, পরিবারের ভালোবাসা, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং প্রিয়জনদের উৎসাহ রয়েছে। নিজের পড়াশোনার কৌশল সম্পর্কে আতিউর বলেন, কোনো শর্টকাট ছিল না।
প্রতিদিন অল্প হলেও পড়ার চেষ্টা করেছেন। ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া, মুখস্থনির্ভর না হয়ে বিষয়গুলো বোঝা, নিয়মিত পুনরাবৃত্তি এবং পুরো শিক্ষাজীবনজুড়ে ধারাবাহিক প্রস্তুতি নেওয়াই ছিল তার মূল কৌশল। আটটি সেমিস্টারজুড়ে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। স্বর্ণপদকের খবর জানার পর তার মনে হয়েছিল, একদিন তাঁকেও এমন একটি অর্জনের জন্য চেষ্টা করতে হবে। সেই ইচ্ছা তাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
ছয় শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে সাফল্যের ভিন্ন ভিন্ন গল্প। কারও পথচলায় ছিল প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা, কারও ছিল যাতায়াত ও আবাসনসংকট, আবার কারও জীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও পেশাগত দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা।
তবে তাদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট, নিয়মিত পড়াশোনা, নিজের প্রতি বিশ্বাস, পরিবার ও শিক্ষকদের সহযোগিতা এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টা তাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক তাদের কাছে যেমন আনন্দ ও গর্বের, তেমনি ভবিষ্যতে নিজেদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর অনুপ্রেরণাও। অর্জিত সাফল্যকে ভিত্তি করে কর্মজীবনে দায়িত্ব পালন, উচ্চশিক্ষা ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করার প্রত্যয় জানিয়েছেন তারা।

