...|...|...

সারাদেশ

ধর্ম অবমাননার নেপথ্যে ছিল স্ত্রীর সাথে ঝগড়া, এরপর হাসপাতাল থেকে বের করে হত্যা

টাইমস টুডে প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, রাত ৩:৩২
Shares
ধর্ম অবমাননার নেপথ্যে ছিল স্ত্রীর সাথে ঝগড়া, এরপর হাসপাতাল থেকে বের করে হত্যা

নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম। ছবি: সংগৃহীত

সাতক্ষীরার দেবহাটায় স্ত্রীর সাথে ঝগড়ার একটি অডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। 

পরিবারের দাবি, শামীম মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। ব্যক্তিগত কথোপকথনের অডিওকে কেন্দ্র করে তাকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তাকে মারধর করা হয় এবং হাসপাতালে নেওয়ার পরও হামলা চালানো হয়।

ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক আমিনী তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে দুই দফা লাইভ করেন। এসব লাইভে তিনি শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শাস্তির দাবি জানান এবং লোকজনকে ঘটনাস্থলে আসার আহ্বান জানান।

গত মঙ্গলবার বেলা ৩টা ৩১ মিনিটে প্রথমবার লাইভে আসেন ফজলুল হক। ১৯ মিনিট ১৯ সেকেন্ডের ওই লাইভে তিনি একটি অডিও শোনান। অডিওটি শামীমের বলে দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি শামীমের বাড়ির ঠিকানা উল্লেখ করে তার শাস্তির দাবি জানান।

একই দিন বিকেল ৫টা ৩১ মিনিটে আবার লাইভ করেন ফজলুল হক। এবার তিনি একটি পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারের সামনে থেকে লাইভে যুক্ত হন। সেখানে শামীম চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ৬ মিনিট ১৬ সেকেন্ডের ওই লাইভে তিনি লোকজনকে চেম্বারের সামনে আসতে বলেন। এ সময় তার আশপাশে লোকজন জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে কয়েক শ মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। পরে শামীমকে তাদের হাতে তুলে দিতে পল্লিচিকিৎসককে চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাটিতে পড়ে থাকা শামীমকে ঘিরে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েকজন তার বুকের ওপর পা দিয়ে আঘাত করছেন। আরেকটি ভিডিওতে দেবহাটা উপজেলা সদরে শামীমের শাস্তির দাবিতে মিছিল করতে দেখা যায়। মিছিলের সামনে ফজলুল হক ছিলেন বলে ভিডিওতে দেখা গেছে।

নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুল রহমানের ছেলে। গত মঙ্গলবার কয়েক দফা মারধরের পর তার মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, ফজলুল হকের নেতৃত্বে একদল লোক তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন।

মৃত্যুর পর ফেসবুকে পোস্ট

গত মঙ্গলবার রাত ১১টা ১১ মিনিটে ও রাত ১২টা ৮ মিনিটে ফেসবুকে দুটি পোস্ট করেন ফজলুল হক। প্রথম পোস্টে শামীমকে ‘কই মাছের জান’ বলে উল্লেখ করেন। দ্বিতীয় পোস্টে তার হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান বলেন, তার ভাই দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। কখনো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেন, আবার কখনো অসংলগ্ন আচরণ করতেন। এলাকার মানুষও তার অসুস্থতার বিষয়টি জানতেন।

তাওসিফের অভিযোগ, মঙ্গলবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফজলুল হকের নেতৃত্বে জামায়াতের সমর্থক হিসেবে পরিচিত একদল লোক তার ভাইকে মারধর করেন। পরে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখানেও দলবল নিয়ে হামলা চালানো হয়। একপর্যায়ে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

তিনি জানান, শামীম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। পাশাপাশি কামিল পাস করেন এবং হোমিওপ্যাথি নিয়েও পড়াশোনা করেছেন। তার স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল জানান, গত সোমবার শামীম ও তার স্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার সময় কথাগুলো অন্য কেউ রেকর্ড করেছিলেন বলে তার দাবি। ওই অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর বক্তব্য রয়েছে এমন অভিযোগ ওঠার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে দরজা ও দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করা হয়।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর শামীমকে প্রথমে বাড়ির পাশের সুবর্ণাবাদ বাজারে মারধর করা হয়। এরপর বাড়িতে ফিরে তিনি বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে তাকে পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে নেওয়া হয়।

পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে ফজলুল হকের নেতৃত্বে লোকজন ওই চেম্বার থেকে শামীমকে বের করে আবার মারধর করেন বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। সেখানেও তার ওপর হামলা হয়।

দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, শতাধিক লোক হাসপাতালে ঢুকে শামীমকে মারধর করেন। পরে তাকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আবার মারধর করা হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়।

অভিযুক্ত ফজলুল হকের বক্তব্য

ফজলুল হক বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে মারধর করা অপরাধ। তবে মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কেউ কটূক্তি করলে শরিয়তের বিধান ভিন্ন। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অতীতে প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপে তিনি সন্তুষ্ট নন বলেও জানান।

তিনি দাবি করেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে তিনি যুক্ত নন। ধর্ম, কোরআন ও মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কেউ বিরূপ মন্তব্য করলে প্রতিবাদ জানাতে তিনি নিজে থেকে এগিয়ে যান। এ ধরনের ঘটনায় বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

ফজলুল হক বলেন, তিনি একসময় মসজিদের ইমাম ছিলেন। বর্তমানে গ্রামের বাজারে পশু জবাইয়ের কাজ করেন। পাশাপাশি মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করেন।

জামায়াতের বক্তব্য

শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইমদাদুল হক বলেন, কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া উচিত ছিল।

তিনি বলেন, এ ঘটনাকে জামায়াত-শিবিরের দলীয় কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না। আমি শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় নিন্দা জানাই এবং জামায়াত এ ধরনের সহিংসতা সমর্থন করে না।

মামলা করেছে পরিবার

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বৃহস্পতিবার দুপুর ও সন্ধ্যায় জানান, শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ফজলুল হক আমিনীর উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তাকে আটক করতে অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।

ওসি বলেন, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো পুলিশ সংরক্ষণ করেছে। ভিডিও পর্যালোচনা ও প্রযুক্তির সহায়তায় হামলা ও মারধরে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

তিনি আরও জানান, নিহত শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় ফজলুল হকসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ২০০ থেকে ২৫০ জনকে।