...|...|...

লাইফস্টাইল

দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করলে মেরুদণ্ডের যে ক্ষতি হয়

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, সকাল ১১:০৩ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬, সকাল ৮:৪৫
Shares
দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করলে মেরুদণ্ডের যে ক্ষতি হয়

ছবি: এআই জেনারেটেড

বর্তমান যুগে আধুনিক জীবনযাত্রায় আমরা প্রতিদিন গড়ে ৮-১০ ঘণ্টা বসে কাটাই- অফিসের ডেস্ক জব, অনলাইন ক্লাস কিংবা বাসায় মোবাইল-টিভি দেখা। মানবদেহ মূলত হাঁটাচলা ও নড়াচড়ার জন্য তৈরি, দীর্ঘক্ষণ স্থির বসে থাকার জন্য নয়। ফলে এই আধুনিক জীবনযাত্রা মেরুদণ্ডের উপর যে চাপ সৃষ্টি করছে, তা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক শারীরিক জটিলতার জন্ম দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটানা বসে থাকা এখন ‘নতুন ধূমপান’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ধীরে ধীরে ক্ষতি করে যায়, যা আমরা প্রথম দিকে টের পাই না।

কী কী সমস্যা হয়

১. ডিস্কের উপর অতিরিক্ত চাপ

মেরুদণ্ডের কশেরুকার মাঝে থাকা নরম, জেলির মতো ডিস্কগুলো শরীরের ভার বহন ও শক শোষণের কাজ করে। দাঁড়ানো অবস্থার তুলনায় বসা অবস্থায় এই ডিস্কের উপর প্রায় দ্বিগুণ চাপ পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এই চাপ চলতে থাকলে ডিস্ক ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, শুকিয়ে যায় এবং স্থিতিস্থাপকতা হারায়।

২. স্লিপ ডিস্ক ও ডিস্ক হার্নিয়েশন

ডিস্কের ক্ষয় বাড়তে থাকলে একসময় ডিস্কের বাইরের আবরণ ফেটে ভেতরের নরম অংশ বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে, যাকে বলে স্লিপ ডিস্ক বা ডিস্ক হার্নিয়েশন। এটি স্নায়ুর উপর চাপ ফেলে তীব্র ব্যথা, পায়ে বা হাতে ঝিনঝিন ভাব, এমনকি মাংসপেশির দুর্বলতা তৈরি করতে পারে।

৩. পেশির দুর্বলতা ও ভারসাম্যহীনতা

বসে থাকা অবস্থায় কোর মাসল (পেট ও কোমরের গভীরের পেশি) নিষ্ক্রিয় থাকে, ফলে এগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। একইসাথে হিপ ফ্লেক্সর পেশি সংকুচিত ও টানটান হয়ে যায়। এই ভারসাম্যহীনতাকে বলা হয় ‘লোয়ার ক্রসড সিনড্রোম’, যেখানে শরীরের সামনের ও পেছনের পেশির মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়- ফলাফল হিসেবে দেখা দেয় কোমর ব্যথা ও ভুল ভঙ্গি।

৪. টেক নেক (Tech Neck)

স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ঘাড় সামনে ঝুঁকিয়ে বসার অভ্যাস থেকে তৈরি হয় এই সমস্যা। মাথা যত সামনে ঝোঁকে, ঘাড়ের পেশিকে তত বেশি ওজন বহন করতে হয়- স্বাভাবিক অবস্থানের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি চাপ পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ঘাড়ে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, শক্তভাব এবং ঘাড়ের প্রাকৃতিক বক্রতা নষ্ট করে দিতে পারে।

৫. রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়া

একটানা বসে থাকলে পায়ের রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ে এবং সামগ্রিক রক্ত সঞ্চালন ধীর হয়ে যায়। এতে পেশিতে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছানোর গতি কমে যায়, ফলে পেশি দ্রুত ক্লান্ত হয় এবং পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ধীর হয়ে পড়ে।

৬. স্নায়ুতে চাপ ও সায়াটিকা

দীর্ঘক্ষণ ভুল ভঙ্গিতে বসলে নিতম্বের পেশি (পিরিফর্মিস) সায়াটিক স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা থেকে সায়াটিকা নামক সমস্যা দেখা দেয়- কোমর থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত বিস্তৃত ব্যথা, ঝিনঝিন ভাব বা অবশতা।

সতর্কতামূলক লক্ষণসমূহ

  • দীর্ঘদিন ধরে কোমরে বা পিঠে ব্যথা থাকা।
  • বসা থেকে উঠতে কষ্ট হওয়া।
  • ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, হাত-পায়ে ঝিনঝিন বা অবশ ভাব।
  • দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ালে বা হাঁটলে ব্যথা বাড়া।
  • মাথাব্যথার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া।

এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে বুঝতে হবে মেরুদণ্ডে সমস্যা শুরু হয়েছে।

সমাধান ও প্রতিকার

দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন

প্রতি ৩০-৪০ মিনিট পরপর উঠে দাঁড়ানো ও কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করা সবচেয়ে কার্যকর প্রতিকার। বসার সময় মেরুদণ্ড সোজা রেখে, পিঠে সাপোর্ট দিয়ে বসা উচিত। মনিটর চোখের সমান উচ্চতায় রাখা এবং পা মাটিতে সমতলভাবে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

এরগোনমিক সেটআপ

এমন চেয়ার ব্যবহার করা উচিত যা কোমরের স্বাভাবিক বক্রতাকে সাপোর্ট দেয়। প্রয়োজনে ল্যাম্বার সাপোর্ট কুশন ব্যবহার করা যায়। স্ট্যান্ডিং ডেস্ক ব্যবহার করে বসা ও দাঁড়ানোর মধ্যে পরিবর্তন আনাও একটি ভালো সমাধান।

শারীরিক ব্যায়াম ও স্ট্রেচিং

কোর মাসল শক্তিশালী করার ব্যায়াম (যেমন প্ল্যাংক), হিপ ফ্লেক্সর স্ট্রেচ, ঘাড় ও কাঁধের স্ট্রেচিং নিয়মিত করলে পেশির ভারসাম্য ফিরে আসে। সাঁতার, হাঁটা বা যোগব্যায়ামের মতো কম চাপযুক্ত ব্যায়াম মেরুদণ্ডের স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।

চিকিৎসা পদ্ধতি

সমস্যা বেড়ে গেলে ফিজিওথেরাপি নেওয়া যেতে পারে, যেখানে নির্দিষ্ট ব্যায়ামের মাধ্যমে পেশি শক্তিশালী ও নমনীয় করা হয়। তীব্র ব্যথার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যথানাশক বা প্রদাহনাশক ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে চিরোপ্রাক্টিক চিকিৎসা বা স্পাইনাল ডিকম্প্রেশন থেরাপিও কার্যকর হতে পারে। তবে ডিস্ক হার্নিয়েশনের মতো গুরুতর অবস্থায় সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে, যা একমাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শেই নেওয়া উচিত।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

ব্যথা যদি দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, পায়ে দুর্বলতা অনুভব হয়, মূত্রথলি বা মলত্যাগে নিয়ন্ত্রণ কমে যায়, কিংবা ব্যথা রাতে ঘুমের মধ্যেও বাড়তে থাকে- তাহলে দেরি না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার অভ্যাস সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া কঠিন, কিন্তু সচেতন হয়ে সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে মেরুদণ্ডের ক্ষতি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।