গত ১২ আগস্ট ইউরোপের আকাশে ঘটে গেছে একটি ঐতিহাসিক পূর্ণ সূর্যগ্রহণ- স্পেনের আইবেরিয়ান উপদ্বীপ থেকে শত বছরেরও বেশি সময় পর দৃশ্যমান হওয়া প্রথম পূর্ণ সূর্যগ্রহণ এটি।
সেই ঘটনার মাত্র ১৬ দিনের মাথায়, ২৮ আগস্ট আবারও আকাশে ঘটতে চলেছে আরেকটি উল্লেখযোগ্য মহাজাগতিক ঘটনা- এবার একটি গভীর আংশিক চন্দ্রগ্রহণ।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এই আংশিক চন্দ্রগ্রহণের মাত্রা (ম্যাগনিটিউড) হবে প্রায় ০.৯৩, যার অর্থ চাঁদের প্রায় ৯৩ শতাংশ পৃথিবীর গাঢ় ছায়া বা উম্ব্রায় ঢুকে যাবে।
এত গভীর একটি আংশিক গ্রহণ দেখতে প্রায় পূর্ণগ্রহণের মতোই মনে হতে পারে- চাঁদের বেশিরভাগ অংশ তামাটে-লালচে রঙ ধারণ করবে, আর উত্তর প্রান্তের সামান্য একটি অংশ উজ্জ্বল সাদা থেকে যাবে।
গ্রহণটি শুরু হবে ২৭ আগস্ট রাতে এবং শেষ হবে ২৮ আগস্ট সকালে (বিশ্বজনীন সময় বা UTC অনুসারে), সব মিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়া- পেনাম্ব্রাল পর্যায়সহ প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা স্থায়ী হবে। এর মধ্যে প্রকৃত আংশিক (উম্ব্রাল) পর্যায় স্থায়ী হবে প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টা।
কেন এটি পূর্ণগ্রহণ নয়
চন্দ্রগ্রহণ ঘটে যখন সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে পৃথিবী চলে আসে এবং পৃথিবীর ছায়া গিয়ে পড়ে চাঁদের ওপর। ২৮ আগস্টের গ্রহণে চাঁদের সম্পূর্ণ অংশ পৃথিবীর গাঢ় কেন্দ্রীয় ছায়ায় (উম্ব্রা) প্রবেশ করবে না- উত্তরের একটি সরু অংশ ছায়ার বাইরে থেকে যাবে। এ কারণেই একে ‘আংশিক’ চন্দ্রগ্রহণ বলা হচ্ছে, যদিও এর গভীরতার কারণে দেখতে প্রায় পূর্ণগ্রহণের মতোই লাগতে পারে।
সূর্যগ্রহণের বিপরীতে, চন্দ্রগ্রহণ দেখার জন্য বিশেষ কোনো চশমা, ফিল্টার বা সুরক্ষা সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না। খালি চোখেই এটি সম্পূর্ণ নিরাপদে দেখা যাবে। দূরবীন বা টেলিস্কোপ ব্যবহার করলে দৃশ্যটি আরও স্পষ্ট ও উপভোগ্য হবে, তবে তা আবশ্যক নয়।
কোথা থেকে দেখা যাবে?
এই গ্রহণ বিশ্বের সব জায়গা থেকে দেখা যাবে না, কারণ চন্দ্রগ্রহণ দেখা যায় শুধু সেসব অঞ্চল থেকে, যেখানে ঘটনার সময় চাঁদ দিগন্তের ওপরে অবস্থান করবে।
- উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা: এখান থেকে পুরো গ্রহণ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, চাঁদ আকাশে উঁচুতে থাকা অবস্থায় দেখা যাবে- সবচেয়ে ভালো দৃশ্যমানতা এখানেই।
- ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য: এসব অঞ্চলে গ্রহণ দেখা যাবে ভোররাতে, চাঁদ পশ্চিম দিগন্তে অস্ত যাওয়ার ঠিক আগে আগে। স্পেনের ক্ষেত্রে দেশের মধ্য ও পূর্বাঞ্চল, বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ ও মেলিয়ায় গ্রহণের আংশিক পর্যায় শেষ হওয়ার আগেই চাঁদ অস্ত যাবে; অন্যদিকে বাকি উপদ্বীপীয় অঞ্চল, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ ও সেউতায় চাঁদ অস্ত যাওয়ার পরই গ্রহণের আংশিক পর্যায় শেষ হবে।
- হাওয়াই, আলাস্কা ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল: এখানে চাঁদ উদয় হবে গ্রহণ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে যাওয়া অবস্থাতেই।
- এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া: দুঃখজনকভাবে, ভারত, চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বাংলাদেশসহ এশিয়ার বেশিরভাগ অংশ এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে এই গ্রহণ দেখা যাবে না, কারণ ঘটনার পুরো সময়টায় চাঁদ এসব অঞ্চলের দিগন্তের নিচে থাকবে। মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার কিছু অংশ থেকে শুধু গ্রহণের অতি মৃদু পেনাম্ব্রাল পর্যায় সামান্য দেখা যেতে পারে।
যেসব অঞ্চল থেকে গ্রহণ দৃশ্যমান হবে, সেখানকার দর্শকদের জন্য পরিষ্কার ও খোলা দিগন্তের জায়গা বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যেদিকে চাঁদ অস্ত যাবে সেদিকে।
কারণ ইউরোপ ও আফ্রিকার মতো অঞ্চলে চাঁদ দিগন্তের কাছাকাছি অবস্থায় থাকবে, তাই ভবন বা পাহাড়ে দৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হলে দৃশ্য মিস হতে পারে। আকাশের অবস্থা অর্থাৎ আবহাওয়া ও মেঘের উপস্থিতিও দৃশ্যমানতায় বড় ভূমিকা রাখবে।
এরপর কবে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ?
২৮ আগস্টের এই ঘটনার পর গভীর লালচে চাঁদ দেখার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে- পরবর্তী পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ ঘটবে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ১ জানুয়ারির রাতে, যা ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া থেকে দেখা যাবে।
তথ্যসূত্র:
- Euronews
- BBC Sky at Night Magazine


