ভারতের আসাম রাজ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চল দখলমুক্ত করার অভিযানে এক হাজারের বেশি পরিবার উচ্ছেদের শিকার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব পরিবারের বড় অংশ বাঙালি মুসলিম বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংখ্যালঘু সংগঠন। অভিযানে একাধিক মসজিদও ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। তবে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারের সঠিক সংখ্যা এবং মসজিদ ভাঙার অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন সরকারের পরিচালিত এ অভিযান গত শনি ও রোববার নগাঁও, হোজাই ও গোলাঘাট জেলায় চালানো হয়। বিভিন্ন সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুই দিনে ১ হাজার ১০০টিরও বেশি পরিবার উচ্ছেদের মুখে পড়ে।
এর মধ্যে নগাঁও জেলার লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে রোববার সবচেয়ে বড় অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেখানে এক দিনে প্রায় ৩১৪ হেক্টর জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এতে কয়েক শ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, তারা কয়েক দশক ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছেন। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, সরকারি উদ্যোগেই তাদের সেখানে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। ফলে তাদের অবৈধ দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করে উচ্ছেদ করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
অন্যদিকে, আসাম সরকার বনভূমি দখলমুক্ত করার পদক্ষেপকে উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও অভিযানের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন।
তবে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছে অল আসাম মাইনরিটিজ স্টুডেন্টস ইউনিয়ন। সংগঠনটির দাবি, উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর বড় অংশ মুসলিম এবং অভিযানে একাধিক মসজিদও ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের মানুষকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হচ্ছে। অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি।
সংগঠনটির এক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, লুতুমারি বনাঞ্চল থেকে উচ্ছেদ হওয়া কিছু পরিবারকে ১৯৭৩ সালে সরকার সাময়িকভাবে সেখানে পুনর্বাসিত করেছিল। তবে এই দাবির পক্ষে সরকারি নথি ও পুনর্বাসনসংক্রান্ত দলিল যাচাই করা প্রয়োজন।
এর আগে গত জুনে অল ইন্ডিয়া ইউনিয়ন অব ফরেস্ট ওয়ার্কিং পিপলস আসাম সরকারকে ওই বনাঞ্চলের গ্রামগুলোতে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিল। সংগঠনটির যুক্তি, এলাকার চারটি গ্রামের বসতি গড়ে উঠেছিল ‘টংগিয়া’ বন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির অধীনে।
টংগিয়া পদ্ধতিতে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে বসবাসকারী মানুষ গাছ লাগানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্তে খাদ্যশস্য চাষ করতেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে চালু হওয়া এই ব্যবস্থায় বন সংরক্ষণের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শ্রম ও জীবিকাকে যুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আসামের কিছু এলাকাতেও এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।
উচ্ছেদবিরোধীদের বক্তব্য, ঐতিহাসিকভাবে বন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত এসব পরিবারকে শুধু বনভূমির দখলদার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। অন্যদিকে, সরকারি বিধি অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চল দখলমুক্ত করার প্রশ্নে প্রশাসনের অবস্থান আলাদা।
সব মিলিয়ে, আসামের উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে বনভূমি সংরক্ষণ, দীর্ঘদিনের বসতি, পুনর্বাসনের ইতিহাস এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ- এসব বিষয় সামনে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা, পুনর্বাসনের নথি এবং মসজিদ ভাঙার অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা গেলে পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।


