এক্স (সাবেক টুইটার) বা ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পছন্দের বিষয়ই বেশি দেখবেন- এটাই স্বাভাবিক ধারণা। কিন্তু স্ট্যানফোর্ড ও এমআইটির গবেষকদের নতুন এক গবেষণা বলছে, বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো।
প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস (PNAS)- এ সম্প্রতি প্রকাশিত এই গবেষণা অনুযায়ী, এক্সের অ্যালগরিদম এমন পোস্টই বেশি সামনে আনতে পারে, যেগুলোর সাথে ব্যবহারকারীর নিজের মূল্যবোধের মিল নেই- বরং সংঘাত রয়েছে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন এমআইটির জিভ এপস্টাইন, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারনাজ জাহানবক্শ এবং স্ট্যানফোর্ডের মাইকেল বার্নস্টেইন।
যুক্তরাষ্ট্রের ৭১৫ জন এক্স ব্যবহারকারীর ওপর এই গবেষণা চালানো হয়। গবেষকেরা প্রতিটি ব্যবহারকারীর দুটি আলাদা ফিড বিশ্লেষণ করেছেন- একটি হলো ‘ফলোয়িং’ ফিড, যেখানে ব্যবহারকারী নিজে যেসব অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করেন তাদের পোস্ট দেখানো হয়, আর অন্যটি হলো ‘ফর ইউ’ পাতা, যেখানে অ্যালগরিদম নিজে বেছে বেছে পোস্ট দেখায়।
প্রতিটি পোস্টে প্রকাশিত মূল্যবোধ চিহ্নিত করতে গবেষকেরা একটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভাষা মডেল (এলএলএম) ব্যবহার করেছেন, এবং তা তুলনা করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীর নিজের ঘোষিত মূল্যবোধের সাথে (মনোবিজ্ঞানের প্রচলিত শোয়ার্জ মূল্যবোধ স্কেল অনুযায়ী)।
ফলাফলে দেখা গেছে, ব্যবহারকারীর অনুসরণ করা অ্যাকাউন্টগুলোর পোস্ট সাধারণত তার নিজের মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কিন্তু ‘ফর ইউ’ পাতায় অ্যালগরিদম যেসব পোস্ট বেশি করে সামনে আনে, সেগুলোর সাথে ব্যবহারকারীর মূল্যবোধের একটি সামগ্রিক নেতিবাচক সম্পর্ক বা অসামঞ্জস্য দেখা গেছে।
কেন এমনটা ঘটে
গবেষকদের মতে, এর পেছনে মূল কারণ লুকিয়ে আছে ব্যবহারকারীর প্রতিক্রিয়া জানানোর ধরনে। সাধারণত মানুষ কোনো পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানায় মূলত ‘লাইক’ দিয়ে- অর্থাৎ হৃদয় বা থাম্বস-আপ বাটনে চাপ দিয়ে।
কিন্তু মন্তব্য বা রিপ্লাই লেখার ঘটনা তুলনামূলক কম ঘটে, আর গবেষকেরা দেখেছেন, মানুষ প্রায়ই এমন পোস্টেই বেশি মন্তব্য করেন, যেগুলোর সাথে তারা দ্বিমত পোষণ করেন বা যেগুলো তাদের বিরক্ত করে।
সমস্যাটা এখানেই- এক্সের অ্যালগরিদম এই বিরল রিপ্লাইগুলোকে লাইকের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে বিবেচনা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সামগ্রিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে রিপ্লাই ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, তবু ব্যবহারকারীকে পরবর্তীতে কী দেখানো হবে তা নির্ধারণে এই ছোট অংশটিই বড় প্রভাব ফেলে।

অর্থাৎ, কোনো পোস্টে লাইক দেওয়া প্ল্যাটফর্মকে বলে যে আপনি সেটি উপভোগ করেছেন, কিন্তু অপছন্দের কোনো পোস্টের নিচে তর্ক করাও অ্যালগরিদমকে জানিয়ে দেয় যে পোস্টটি আপনার মনোযোগ কেড়ে নিতে পেরেছে- আর অ্যালগরিদম মনোযোগকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।
এভাবেই তৈরি হয় একধরনের চক্র। ব্যবহারকারী কোনো পোস্টে প্রতিক্রিয়া দেখান, অ্যালগরিদম সেটিকে আগ্রহের সংকেত হিসেবে গ্রহণ করে, এরপর একই ধরনের আরও পোস্ট সামনে আনে, আর ব্যবহারকারী আবারও প্রতিক্রিয়া দেখান- ফলে একই বিষয়বস্তু বারবার ফিরে আসতেই থাকে।
রাজনৈতিক পক্ষভেদে প্রভাবের পার্থক্য
গবেষণায় দেখা গেছে, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান- উভয় দলের সমর্থকদের ক্ষেত্রেই তাদের নিজস্ব মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক পোস্ট বেশি করে সামনে আসার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। তবে এই প্রবণতা ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ছিল। কেন এমনটা ঘটছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ গবেষকেরা এখনো নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
গবেষক জিভ এপস্টাইনের মতে, এর পেছনে হয়তো এক্স প্ল্যাটফর্মে সামগ্রিকভাবে ডানপন্থী কনটেন্টের আধিক্য, অথবা ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের দ্বিমতের পোস্টে বেশি জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা- কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের সাথে জড়িত মনস্তাত্ত্বিক কোনো কারণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বিষয়ে অতিরিক্ত অনুমান না করার ব্যাপারেও তিনি সতর্ক করেছেন।
কোন ধরনের পোস্ট বেশি ও কম দেখানো হয়
‘ফর ইউ’ পাতায় দেখানো পোস্ট বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা লক্ষ করেছেন, ঐতিহ্য রক্ষা, নিয়ম মেনে চলা এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো মূল্যবোধসংবলিত পোস্ট অ্যালগরিদম তুলনামূলক বেশি সামনে আনে।
বিপরীতে, অন্যকে সাহায্য করা, দূরের মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের মতো মূল্যবোধসংবলিত পোস্ট তুলনামূলক কম প্রাধান্য পায়।

গবেষকেরা স্পষ্ট করে বলছেন, এর মানে এই নয় যে অ্যালগরিদম ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহারকারীকে বিরক্ত করার চেষ্টা করছে। বরং এটি মূলত অ্যালগরিদমের ‘শেখার’ প্রক্রিয়ার একটি অনিচ্ছাকৃত ফলাফল- যেহেতু এটি মূল লক্ষ্য হিসেবে ‘এনগেজমেন্ট’ বা সম্পৃক্ততাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, আর মানুষের আচরণে বিরক্তি বা রাগও সম্পৃক্ততার একটি শক্তিশালী রূপ।
স্ট্যানফোর্ড হিউম্যান-সেন্টার্ড এআই ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় প্রকাশিত এই গবেষণার সহলেখক মাইকেল বার্নস্টেইনের ভাষায়, প্ল্যাটফর্মগুলোর উচিত শুধু এনগেজমেন্ট নয়, ব্যবহারকারী প্রকৃতপক্ষে কী নিয়ে চিন্তিত- অর্থাৎ তার মূল্যবোধকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া।
এই গবেষণার তাৎপর্য
গবেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ঠিক কীভাবে কাজ করে, তা সাধারণ ব্যবহারকারীর জানার সুযোগ সীমিত- অথচ এসব অ্যালগরিদম মানুষ কোন তথ্য দেখবে এবং কোন বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
তাই কোনো পোস্ট বারবার সামনে এলেই সেটিকে নিজের পছন্দের বিষয় বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং অনেক সময় যে পোস্টে আপনি সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখান- তা পছন্দ হোক বা অপছন্দ সেটিই ভবিষ্যতে আপনার সামনে বারবার আসতে থাকে।


