দেশে গ্রামীণ পর্যায়ের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আশির দশকে দেশব্যাপী চালু হয়েছিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এর মূল লক্ষ্য ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্থানীয় পর্যায়েই মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। তবে সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন খাতে ব্যাপক পরিবর্তন ও অগ্রগতি হলেও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য খাতের চিত্রে তেমন কোনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।
বর্তমানে উপজেলা হাসপাতালগুলোতে পৌঁছালেই চোখে পড়ে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। অবকাঠামো তৈরি হলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তীব্র সংকট, প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কক্ষ (ওটি) সচল না থাকা, আইসিইউ সুবিধা না থাকা এবং আধুনিক রোগ নির্ণয়যন্ত্রের অভাব বা অকেজো দশাই প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা, হৃদরোগ, প্রসূতি জটিলতা কিংবা স্ট্রোকের মতো জরুরি সংকটে পড়লে প্রাথমিক চিকিৎসার পর চিকিৎসকেরা রোগীদের দ্রুত জেলা বা ঢাকায় স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে যেখানে বিদ্যমান ৫১ শয্যার হাসপাতালেই প্রয়োজনীয় ওষুধ-যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসক সংকটে চিকিৎসা ব্যবস্থা জোড়াতালি দিয়ে চলছে, সেখানে এবার হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সরকার এই উদ্যোগ কতটুকু কাজে দিবে?
গত ৩ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালালউদ্দীন রুমী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো.সাখাওয়াত হোসেনও জানিয়েছেন একই কথা। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল ভবনের আয়তন আর শয্যা সংখ্যা বাড়ালেই স্বাস্থ্যসেবার মান ফিরবে না, যদি না প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি মেটানো হয়। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি রোগীর পকেটের বাড়তি খরচ ও ভোগান্তি একই থেকে যাবে।
শয্যা বাড়লেও রয়েছে শঙ্কা
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার মূল উদ্দেশ্য প্রান্তিক পর্যায়ে সেবার মান বাড়ানো, একইসাথে ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমানো। কিন্তু বর্তমানে ৫১ শয্যার তৃণমূলের বাস্তব চিত্রই সম্পূর্ণ ভিন্ন।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার কৃষক রুস্তম আলী (৪৫) সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে রাতে ছুটে যান স্থানীয় ৫১ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু জরুরি বিভাগের ডাক্তার প্রাথমিক ব্যান্ডেজ করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি। এক্স-রে করার মতো কোনো টেকনিশিয়ান সেখানে ছিলেন না, ছিলেন না কোনো সার্জনও।
কর্তব্যরত চিকিৎসক সরাসরি জানিয়ে দেন, ‘রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক, দ্রুত যশোর বা ঢাকাতে নিয়ে যায় যান’। এরপর অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার ১৫ হাজার টাকা জোগাড় করতেই পেরিয়ে যায় তিন ঘণ্টা। প্রায় দুইশত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে জহিরুলের রক্তক্ষরণে অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
রুস্তমের এই ভোগান্তি কোনো একক ঘটনা নয়; দেশের সিংহভাগ উপজেলা হাসপাতালের চিত্রই এমন। সামান্য একটু স্যালাইন বা ব্যথানাশক ওষুধ ছাড়া জটিল চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত জনবল, যন্ত্রপাতি,চিকিৎসক কোনোটিই এখনও পর্যন্ত পরিপূর্ণ না এসব হাসপাতালগুলোতে। ফলে, দেখা যায় যেসব উদ্দেশ্য নিয়ে ৫১ শয্যার এসব হাসপাতাল উপজেলাগুলোতে তৈরি করা হয়েছিল সেটি কোনো কাজেই আসছে না। স্থানীয় রোগীরা বলছেন, ডাক্তার, জনবল, যন্ত্রপাতি এসবই যদি না থাকে তাহলে ১০০ শয্যার হাসপাতাল বানালেও আমাদের কোনো উপকারে আসবে না, দিন শেষে আমাদের অর্থ খরচ করে সেই ঢাকার কোনো বড় হাসপাতালে ছুটতে হবে।
সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে শঙ্কা ও বিশেষজ্ঞদের মত
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যা বাড়ানোর সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা। তারা মনে করেন, বিদ্যমান সংকট না মিটিয়ে কেবল অবকাঠামো বাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান এনে দেবে না।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ হাসপাতালগুলোতে কেবল বেড বাড়ানোকে একদিক থেকে অযৌক্তিক বলে মনে করেন। টাইমস টুডেকে তিনি বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে যে শুধু বেডের সংখ্যা বাড়লেও আনুপাতিক হারে চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড বয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ওষুধপত্রের বরাদ্দ বা সংখ্যা বাড়ে না এবং প্রয়োজনীয় জনবলও নিয়োগ করা হয় না। ফলে আগে থেকেই লোকবল সংকটে থাকা হাসপাতালের এই বর্ধিত বেডের সেবাটুকু নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। তবে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় নেওয়া এই উদ্যোগকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সামনে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন তিনি।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞর মতে, এই সুযোগটি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে প্যাকেজ পদ্ধতিতে সবকিছু একসাথে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। অর্থাৎ, কেবল বেড বা ভবন নির্মাণ কিংবা শুধু লোকবল নিয়োগ এভাবে আলাদা না করে একটি সমন্বিত প্রকল্পের মাধ্যমে সব কাজ একসাথে সম্পন্ন করতে হবে। ভবন ও বেড প্রস্তুত হওয়ার সাথে সাথে যদি পর্যাপ্ত লোকবল, যন্ত্রপাতি এবং ওষুধের ব্যবস্থা না থাকে, তবে বাড়তি সেবা দেওয়ার এই উদ্যোগটি ব্যাহত হবে। যদিও এটি একটি কঠিন কাজ, তবুও এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করলে অতীতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালের মতো এবারও অর্থের অপচয় হবে এবং মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।
ডা. বেনজির আহমেদ আরও বলেন, কাজগুলো সুচারুভাবে শেষ করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরকে যুক্ত করে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা উচিত, যা আগামী দুই থেকে আড়াই বছরের নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নির্মাণকাজ, যন্ত্রপাতি ক্রয় ও জনবল নিয়োগের কাজগুলো একসঙ্গে তদারকি করবে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয়ে কোনো জটিলতা দেখা দিলে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় তা দ্রুত নিস্পত্তি করা সম্ভব।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদান
শয্যা বা বেড বাড়ানো-কমানোর চেয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে জোরদার করতে হবে বলে মনে করেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। টাইমস টুডেকে তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলেও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত ছিল এবং বর্তমানেও বাজেট বরাদ্দ করা হচ্ছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী প্রতিটি ইউনিয়নে পুরোনো তিনটি ওয়ার্ডের জন্য তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিকের বিপরীতে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা ইউনিয়ন হেলথ সেন্টার থাকা উচিত, যা করা গেলে হাসপাতালের ওপর শয্যা বাড়ানোর চাপ অনেক কমে যাবে। প্রতিটি কেন্দ্রে কমপক্ষে দুজন চিকিৎসক (একজন পুরুষ ও একজন নারী) এবং তিন শিফটে ছয়জন চিকিৎসক প্রয়োজন।
কমিউনিটি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দিকে নজর না দিয়ে কেবল হাসপাতালে শয্যা বাড়ালে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না বলে মনে করেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তার মতে, শুধু হাসপাতাল বাড়ানো বা ডায়ালাইসিস-কমিউনিটি ক্লিনিক বাড়ালেই হবে না বরং রোগ প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রেই যেন সুগার বা ব্লাড প্রেশারের মতো রোগগুলো প্রথম পর্যায়েই ধরা পড়ে এবং নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও জনবল সংকট দূর করতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের সুপারিশ করেন, যেন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের নিজস্ব উদ্যোগে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ক্ষমতা থাকে।
‘এক মাপ সবার জন্য উপযুক্ত নয়’ নীতি
এদিকে দেশের উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করার লক্ষ্যে গৃহীত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ। মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে টাইমস টুডেকে বলেন, আমাদের মূল সংকট কি শয্যা বা ভবনের অভাব নাকি বিদ্যমান অবকাঠামোকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার সক্ষমতার ঘাটতি? বর্তমানে দেশের ৫০ শয্যার উপজেলা হাসপাতালগুলোর বড় অংশেই চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টের তীব্র সংকট রয়েছে; অচল পড়ে আছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি এবং নেই পর্যাপ্ত ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা। ফলে অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও রোগীরা বাধ্য হয়ে জেলা বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভিড় করছেন, যার ফলে উচ্চতর হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে আর উপজেলা পর্যায়ের সক্ষমতা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় ‘এক মাপ সবার জন্য উপযুক্ত নয়’ নীতিটি অনুসরণ করা জরুরি। সব উপজেলার জনসংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান, জেলা হাসপাতালের দূরত্ব এবং সেবার চাহিদা এক নয়; তাই ঢালাওভাবে সব হাসপাতালকে বড় না করে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। বড় ভবন তৈরি করা এককালীন ব্যয় হলেও হাসপাতাল পরিচালনা করা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়, যার সাথে বিপুল পরিচালন বাজেট জড়িত। বড় ভবন দৃশ্যমান হলেও জনগণের জন্য ২৪ ঘণ্টা সচল চিকিৎসা পাওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিপুল অর্থ ব্যয় করার আগে বিদ্যমান ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে পূর্ণাঙ্গ কার্যকর করা এবং স্বচ্ছতার স্বার্থে প্রকল্পের তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করার আহ্বান জানান এই স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ।

