হৃদরোগ এখন বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। চিকিৎসকেরা বলছেন, জীবনযাত্রায় কিছু সহজ পরিবর্তন আনলেই হৃদ্রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে হৃদরোগ মূলত প্রবীণদের সমস্যা হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন কম বয়সীদের মধ্যেও এর প্রকোপ বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার, ধূমপান ও মানসিক চাপকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সুষম ও পরিমিত খাবার
হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, ডাল ও গোটা শস্য রাখা জরুরি। মাছ, বিশেষ করে সামুদ্রিক ও চর্বিসমৃদ্ধ মাছ হৃদ্যন্ত্রের জন্য উপকারী।
অন্যদিকে ট্রান্স ফ্যাট ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, যেমন ডালডা, ফাস্টফুড, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। এসব খাবার রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বাড়িয়ে ধমনিতে চর্বি জমার ঝুঁকি তৈরি করে।
লবণ ও চিনি কমানো
অতিরিক্ত লবণ উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ, যা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের বড় ঝুঁকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দিনে পাঁচ গ্রামের কম লবণ খাওয়ার পরামর্শ দেয়। খাবারের পাতে বাড়তি লবণ নেওয়ার অভ্যাস ছাড়তে বলছেন চিকিৎসকেরা।
একইভাবে সফট ড্রিংক, মিষ্টি ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার ওজন ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়, যা পরোক্ষভাবে হৃদ্যন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম
চিকিৎসকদের পরামর্শ, সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা উচিত। এর জন্য দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সাঁতার কাটার মতো কাজ বেছে নেওয়া যায়। দিনে ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস করলেই উল্লেখযোগ্য উপকার মেলে।
দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা এড়াতে কিছুক্ষণ পরপর উঠে হাঁটাচলার পরামর্শও দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা।
ধূমপান ও তামাক পরিহার
ধূমপান হৃদরোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি। তামাকের রাসায়নিক রক্তনালি সরু করে দেয় এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ায়। জর্দা ও গুলসহ ধোঁয়াবিহীন তামাকও সমান ক্ষতিকর। চিকিৎসকদের মতে, ধূমপান ছাড়লে কয়েক বছরের মধ্যেই হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
অতিরিক্ত ওজন ও ভুঁড়ি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরলের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই উচ্চতা অনুযায়ী স্বাভাবিক ওজন বজায় রাখা জরুরি। পেটের চারপাশে চর্বি জমা হৃদ্রোগের ঝুঁকির বিশেষ সংকেত বলে মনে করা হয়।
পর্যাপ্ত ঘুম
প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি রক্তচাপ ও ওজন বাড়ানোর পাশাপাশি হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপ ফেলে। ঘুমের সময় নাক ডাকা বা শ্বাসকষ্ট হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রার্থনা বা ধ্যান, শখের কাজ এবং নিয়মিত বিশ্রাম মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়মিত পরীক্ষা করানো জরুরি। বিশেষ করে ৪০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি এবং যাঁদের পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস আছে, তাঁদের নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস থাকলে ওষুধ নিয়মিত খেতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বন্ধ করা যাবে না।
যেসব উপসর্গকে অবহেলা নয়
বুকে চাপ বা ব্যথা, ব্যথা বাম হাত, কাঁধ বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা বা হঠাৎ অস্বাভাবিক দুর্বলতা হৃদ্রোগের লক্ষণ হতে পারে। এমন উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে বলছেন চিকিৎসকেরা।
সচেতনতাই প্রতিরোধ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদরোগের বেশির ভাগ ঝুঁকিই জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তাই শুরু থেকেই সচেতন হলে সুস্থ হৃদ্যন্ত্র নিয়ে দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা সম্ভব।


