...|...|...

লাইফস্টাইল

হলুদের স্বাস্থ্যগুণ: প্রচলিত বিশ্বাস বনাম আধুনিক বিজ্ঞান

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, বিকেল ৩:৫৩ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ২:০৪
Shares
হলুদের স্বাস্থ্যগুণ: প্রচলিত বিশ্বাস বনাম আধুনিক বিজ্ঞান

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের মাছের ঝোল, ভারতের চিকেন কারি, সুদানের উটের বিরিয়ানি কিংবা মালয়েশিয়ার লাকসা- পৃথিবীর নানা প্রান্তের হাজারো পদের মধ্যে সহজেই যে মিল খুঁজে পাওয়া যায় তা হলো ‘হলুদ’। 

রান্নায় রং আর স্বাদ আনার পাশাপাশি এই মসলাকে ঘিরে আছে হাজার বছরের ওষুধি বিশ্বাস। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এই বিশ্বাসগুলোকে কতটা সমর্থন করে?

হাজার বছরের সঙ্গী

হলুদের প্রায় ৩০টি জাত রয়েছে, যা এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার রান্নায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের হাত ধরে এই মসলা পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগরের বালি-ফিজি থেকে পশ্চিমে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।

বিবিসির ফুড চেইন অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশীয় প্রবাসী খাদ্য-সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা গবেষক ও পডকাস্টার রাগিনি কাশ্যপ জানান, আড়াই হাজার বছরের পুরনো লেখাতেও হলুদের উল্লেখ পাওয়া যায়। দুবাই প্রবাসী কাশ্যপের কাছে হলুদ শুধু মসলা নয়- অসুখ-বিসুখে প্রথম যে জিনিসটির কথা মনে পড়ে, তার মধ্যে হলুদ অন্যতম, যেখানে মিশে আছে আরাম, ওষুধ আর নস্টালজিয়ার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।

বিয়ের অনুষ্ঠানেও হলুদের আলাদা জায়গা আছে- বর-কনের সৌন্দর্য বাড়াতে বিয়ের আগে গায়ে হলুদের প্রলেপ দেওয়ার রীতি আজও টিকে আছে।

কারকিউমিন: হলুদের আসল শক্তি

হলুদের মূল সক্রিয় উপাদান কারকিউমিন, যা এই মসলাকে তার বিশেষ রং আর ঔষধিগুণ দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কারকিউমিনের প্রদাহনাশক (অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি), অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং জীবাণুনাশক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটি শরীরে প্রদাহ সৃষ্টিকারী নির্দিষ্ট পথগুলোকে বাধা দিয়ে কাজ করে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।

আর্থ্রাইটিস নিয়ে করা বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কারকিউমিন গ্রহণে জয়েন্টের প্রদাহ ও ব্যথা কমতে পারে। ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমানোর ক্ষেত্রেও কারকিউমিনের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে গবেষণা চলছে, যদিও এখনো তা প্রাথমিক পর্যায়ে। হৃদরোগ ও আলঝেইমারের ঝুঁকি কমাতে পারে বলেও কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে।

তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

এত গুণ থাকা সত্ত্বেও কারকিউমিন নিয়ে বিজ্ঞানীদের মূল মাথাব্যথার জায়গা হলো এর বায়োঅ্যাভেইলেবিলিটি বা শরীরে শোষিত হওয়ার ক্ষমতা।

গবেষণা বলছে, একা কারকিউমিন খেলে তা শরীরে খুব সামান্যই শোষিত হয় এবং দ্রুত অন্ত্র থেকে বেরিয়ে যায়- এমনকি ৪ হাজার মিলিগ্রাম পর্যন্ত মাত্রায়ও এটি প্রায় নিষ্ক্রিয় থেকে যেতে পারে।

অর্থাৎ শুধু রান্নায় হলুদ ব্যবহার করলে যে পরিমাণ কারকিউমিন শরীরে ঢোকে, তার সিংহভাগই কাজে লাগার আগেই বেরিয়ে যায়।

ছবি: সংগৃহীত

এখানেই আসে কালোজিরার নয়, বরং গোলমরিচের ভূমিকা। গোলমরিচের সক্রিয় উপাদান পাইপারিন কারকিউমিনের শোষণ ক্ষমতা প্রায় ২০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। 

এই কারণেই ঐতিহ্যবাহী রান্নায় প্রায়ই হলুদের সাথে গোলমরিচ বা তেল-চর্বিযুক্ত উপাদান একসাথে ব্যবহারের চল দেখা যায়-না জেনেই হয়তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ‘বিজ্ঞানসম্মত’ কৌশল অনুসরণ করে এসেছে।

বাস্তবতা যা মাথায় রাখা জরুরি

১. রান্নায় ব্যবহৃত পরিমাণ যথেষ্ট নয়: গবেষণায় যেসব উপকারের কথা বলা হয়, তার বেশিরভাগই ঘটেছে ঘনীভূত কারকিউমিন সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করে, যার মাত্রা সাধারণ রান্নায় ব্যবহৃত হলুদের চেয়ে অনেক বেশি।

২. অলৌকিক নিরাময় নয়: প্রদাহ কমানো বা ব্যথা উপশমে সহায়ক ভূমিকা থাকলেও, হলুদ কোনো রোগের একক বা প্রতিস্থাপনযোগ্য চিকিৎসা নয়। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেন, হলুদকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে না দেখে সহায়ক উপাদান হিসেবে দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ।

৩. ওষুধের সাথে মিথস্ক্রিয়া: উচ্চমাত্রার কারকিউমিন সাপ্লিমেন্ট রক্ত পাতলাকারী বা কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের সাথে প্রতিক্রিয়া করতে পারে। নিয়মিত সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

শেষ কথা

হলুদ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ঘরে ঘরে যে বিশ্বাস চলে আসছে, তার পেছনে পুরোপুরি ভিত্তিহীন কিছু নেই- বরং আধুনিক গবেষণা কারকিউমিনের প্রদাহনাশক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণাগুণকে অনেকাংশে সমর্থনও করে। তবে ‘হলুদ খেলেই সব রোগ সারবে’- এমন প্রচলিত ধারণা বাস্তবতার চেয়ে বিশ্বাসের ওপর বেশি দাঁড়িয়ে আছে।

প্রতিদিনের রান্নায় হলুদ-গোলমরিচের যুগলবন্দি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হতে পারে ঠিকই, কিন্তু বড় কোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় এটিকে ডাক্তারের পরামর্শের বিকল্প ভাবার সুযোগ নেই।