...|...|...

সারাদেশ

সুন্দরবনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ পর্যটক, করমজলে প্রতিদিন ভিড়

শেখ সোহেল, বাগেরহাট
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৪:৩৬
Shares
সুন্দরবনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ পর্যটক, করমজলে প্রতিদিন ভিড়

সুন্দরবন। ছবি: টাইমস টুডে

নদী-খালের জোয়ার-ভাটা, ঘন সবুজের বিস্তীর্ণ বনভূমি আর বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ— প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা সুন্দরবন বরাবরই পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ও ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের এই বনকে ঘিরে দিন দিন বাড়ছে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ। সুন্দরবনের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ, বন্যপ্রাণীর দেখা পাওয়া আর নদীপথে বনের গভীরে প্রবেশের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিতে প্রতিবছরই ছুটে আসছেন হাজারো প্রকৃতিপ্রেমী।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত পর্যটন মৌসুমে সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন আড়াই লাখের বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটক। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশের গন্তব্য ছিল বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র। সহজ যোগাযোগ, স্বল্প সময়ে ভ্রমণের সুযোগ এবং বন্যপ্রাণী দেখার আকর্ষণে পর্যটকদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কেন্দ্রটি।

জোয়ার-ভাটার সাথে মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যায় সুন্দরবনের রূপ। কখনো শান্ত নদীর বুক, কখনো কাদামাটির চর, আবার কখনো ঘন সবুজের আড়াল থেকে উঁকি দেয় হরিণ কিংবা কুমির। ভাগ্য ভালো হলে দেখা মিলতে পারে রয়েল বেঙ্গল টাইগারেরও। সুন্দরী, গেওয়া, গরান ও পশুরসহ নানা প্রজাতির উদ্ভিদ এবং বাঘ, হরিণ, কুমির ও ডলফিনের মতো বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি সুন্দরবনকে করেছে প্রকৃতিপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য।

বিশেষ করে শরণখোলা রেঞ্জের কটকা ও জামতলা সমুদ্রসৈকতে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, নদী-খালে নৌভ্রমণ এবং বনের নীরব-নির্জন পরিবেশ পর্যটকদের বারবার টানে। প্রকৃতির এই অপরূপ রাজ্যে প্রতিটি যাত্রাই যেন নতুন কোনো দৃশ্য, নতুন কোনো অভিজ্ঞতা আর অজানা সৌন্দর্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের চারটি রেঞ্জে রয়েছে হারবাড়িয়া, আন্ধারমানিক, আলীবান্ধা, কলাগাছিয়া, কালবগী, শেখেরটেক, কটকা-কচিখালী, টাইগার পয়েন্ট, জামতলা সি-বিচ, সুপতি, ত্রিকোণ আইল্যান্ড, দুবলারচর, চাঁদপাই, হিরণ পয়েন্ট, দোবেকী, মান্দারবাড়িয়া ও নীলকমলসহ বেশ কয়েকটি আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা। এতসব গন্তব্যের মধ্যে সহজ যোগাযোগ ও স্বল্প সময়ে ঘুরে আসার সুযোগের কারণে পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় করমজল।

সমুদ্রের জোয়ারে দিনে দুইবার প্লাবিত হওয়া সুন্দরবন তীব্র লবণাক্ত, মধ্যম লবণাক্ত ও মিষ্টিপানির অঞ্চলে বিভক্ত। পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগের সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জের কিছু এলাকায় লবণাক্ততার মাত্রা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সবুজের আধিক্য কম। অন্যদিকে, মিষ্টি পানির প্রভাব থাকায় বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে রয়েছে ঘন সবুজ বনভূমি।

২০০০ সালে গড়ে ওঠা করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রটি লোকালয় থেকে মাত্র ২০ মিনিটের নৌপথের দূরত্বে। মোংলা পৌরসভার অপর পাড়ে পশুর নদী পার হলেই পৌঁছানো যায় এই পর্যটনকেন্দ্রে। রাজধানী ঢাকা থেকেও তুলনামূলক কম সময়ে এখানে আসা সম্ভব। দিনে এসে সুন্দরবন ঘুরে একই দিনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকায় প্রতিদিনই শত শত পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে করমজল।

সেপ্টেম্বর থেকে টানা নয় মাস সুন্দরবনে পর্যটন মৌসুম চলে। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা করমজলে ভিড় করেন। সহজ যাতায়াতের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম কাছ থেকে দেখার সুযোগও কেন্দ্রটির প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়িয়েছে।

করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে রয়েছে ২৮টি চিত্রা ও মায়াবি হরিণ। দুটি পুকুর ও দুটি শেডে রয়েছে চারটি মিঠাপানির প্রজাতিসহ লবণপানির ৭১টি ছোট-বড় কুমির। এ ছাড়া দুটি পুকুরে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির ৪৯৭টি বাটাগুর বাসকা কচ্ছপ।

পর্যটকদের জন্য রয়েছে কংক্রিটের উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে উঁচু ফুটট্রেইল, ঝুলন্ত সেতু ও সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি ব্যাখ্যা কেন্দ্র। সেখানে বাঘ, হরিণ, কুমির ও তিমির হাড়সহ বিভিন্ন প্রাণীর দেহাবশেষ, চামড়া ও বাঘের কঙ্কাল প্রদর্শন করা হয়েছে।

ফুটট্রেইলে হাঁটার সময় পর্যটকেরা সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা, শৈবাল ও অর্কিড দেখার সুযোগ পান। পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর বিচরণও তাদের বাড়তি আকর্ষণ জোগায়।

ঢাকা থেকে করমজল ঘুরতে আসা পর্যটক পলাশ শেখ বলেন, সুন্দরবনের কথা অনেক শুনেছি। এবার সরাসরি এসে এর সৌন্দর্য দেখার সুযোগ হয়েছে। নদীপথে বনের ভেতর যাওয়া, সবুজ গাছপালা, হরিণ ও কুমির দেখা—সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটা অসাধারণ। করমজলের পরিবেশও খুব ভালো লেগেছে।

চট্টগ্রাম থেকে আসা শাফিন আহমেদ বলেন, পরিবারের সাথে একদিনের জন্য সুন্দরবন ঘুরতে এসেছি। করমজলের ফুটট্রেইল, ঝুলন্ত সেতু ও বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগ আমাদের খুব ভালো লেগেছে। সুন্দরবনের প্রকৃতি খুব কাছ থেকে দেখার এই অভিজ্ঞতা মনে রাখার মতো। সুযোগ পেলে আবারও এখানে আসতে চাই।

পর্যটন মৌসুমে খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্যুর অপারেটররা জাহাজ ও লঞ্চের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সুন্দরবন ভ্রমণে নিয়ে আসেন। বন বিভাগের অনুমতি নিয়েই এসব নৌযান বনে প্রবেশ করে।

বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে টানা নয় মাস সুন্দরবনে পর্যটন মৌসুম থাকে। এ সময়ে খুলনা থেকে ট্যুর অপারেটররা অর্ধশতাধিক বিলাসবহুল ও আধুনিক জাহাজ-লঞ্চের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সুন্দরবন ভ্রমণে নিয়ে আসেন।

তিনি বলেন, সুন্দরবনে সব সময় অতিরিক্ত মানুষের ভিড় থাকলে ম্যানগ্রোভ বনের প্রাণ-প্রকৃতির ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য বন বিভাগ ইকোট্যুরিজমের ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বনের ওপর চাপ কমাতে ইতোমধ্যে সুন্দরবনে সাতটি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে।

ডিএফও আরও বলেন, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস পর্যটকসহ সব ধরনের বনজীবীর সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ থাকে। ইকোসিস্টেমের ওপর তুলনামূলক কম চাপ পড়ে—এমন একটি পর্যটনকেন্দ্র হওয়ায় করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রটি সারা বছর দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য খোলা রাখা হয়।

গত পর্যটন মৌসুমে আড়াই লাখের বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই করমজল কেন্দ্রে এসেছেন। সরকারি ছুটির পাশাপাশি শুক্র ও শনিবার করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে পর্যটকের চাপ সামাল দিতে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হিমশিম খেতে হয়। পর্যটকদের সেবার পাশাপাশি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন বিভাগ সব সময় কাজ করে যাচ্ছে।

চলতি পর্যটন মৌসুমে বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে সুন্দরবনে প্রায় তিন লাখ পর্যটকের আগমন ঘটতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন এই বন কর্মকর্তা।