রাতে ঘুমানোর আগে মোবাইল, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্র বন্ধ করলেও অনেকের বাড়িতে সারা রাত চালু থাকে ওয়াই-ফাই রাউটার। এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, রাতে ওয়াই-ফাই চালু রাখলে শরীরের ক্ষতি হয় কি না, কিংবা ঘুমানোর আগে রাউটার বন্ধ করে দিলে কোনো স্বাস্থ্যগত উপকার পাওয়া যায় কি না। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সাধারণ মাত্রার ওয়াই-ফাই সংকেতের সংস্পর্শে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়, এমন ধারাবাহিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই রাতে রাউটার বন্ধ রাখা জরুরি কি না, তা নিয়ে রয়েছে নানা কৌতূহল। তারপরও প্রয়োজন না থাকলে রাতে ওয়াই-ফাই বন্ধ রাখার কিছু ব্যবহারিক সুবিধা রয়েছে। ইএমএফ এমপাওয়ারমেন্ট প্রতিবেদনে কিছু তথ্য উঠে এসেছে। চলুন বিষয়গুলো জেনে নিই।
ওয়াই-ফাই বন্ধ রাখলে কি ঘুম ভালো হয়
ভালো ঘুমের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুমের আগে ফোনের ব্যবহার কমানো জরুরি। তবে ওয়াই-ফাই সংকেত সরাসরি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, এমন কোনো প্রমাণ নেই।
২০২০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৩৪ জন সুস্থ তরুণের ওপর সারা রাত ওয়াই-ফাইয়ের রেডিশনের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা ঘুমের বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করে দেখেন, ওয়াই-ফাইয়ের সংস্পর্শে ঘুমের সামগ্রিক মানে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য তাৎক্ষণিক পরিবর্তন পাওয়া যায়নি।
তবে ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করা, ভিডিও দেখা বা রাতে নোটিফিকেশনের শব্দে ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই ঘুম ভালো করতে চাইলে রাউটার বন্ধ করে রাখার পাশাপাশি ঘুমানোর আগে স্ক্রিনের ব্যবহার কমানো এবং ফোন সাইলেন্ট করে রাখা বেশি কার্যকর হতে পারে।
ওয়াই-ফাই রেডিয়েশন কি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়
ওয়াই-ফাই রাউটার থেকে নির্গত তরঙ্গ হলো নন-আয়োনাইজিং রেডিয়েশন বা অ-আয়নীকরণ বিকিরণ। এক্স-রে বা গামা রশ্মির মতো আয়নীকরণ বিকিরণের তুলনায় এর শক্তি অনেকটাই কম। সাধারণ ব্যবহারে ওয়াই-ফাই রেডিয়েশনের সংস্পর্শে ক্যানসার হয়, এমন প্রমাণ এখনো কোনো গবেষণায় পাওয়া যায়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত মাত্রায় ওয়াই-ফাই রেডিয়েশনে সংস্পর্শে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর প্রভাবের ধারাবাহিক তেমন কোনো প্রমাণ নেই। এর অর্থ এই না যে বিজ্ঞান সব ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে চূড়ান্ত উত্তর দিয়ে ফেলেছে, গবেষণা এখনও চলমান। কিন্তু বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে শুধু ক্যানসারের আশঙ্কায় রাতে ওয়াই-ফাই বন্ধ রাখাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাধ্যতামূলক পরামর্শ বলা যায় না।
পুরুষের প্রজননক্ষমতা ও গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি আছে কি
ওয়াই-ফাই বা অন্যান্য বেতার তরঙ্গ পুরুষদের শুক্রাণুর গুণমান, নারীদের প্রজননক্ষমতা কিংবা গর্ভাবস্থায় ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। তবে এসব গবেষণার ফলাফল এক না। অনেক গবেষণায় মোবাইল ফোনের ব্যবহার, প্রাণীর ওপর পরীক্ষা কিংবা পরীক্ষাগারে কোষের ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব ফল সরাসরি বাড়ির ওয়াই-ফাই রাউটারের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার মতো না।
বর্তমান প্রমাণের ভিত্তিতে সাধারণ মাত্রার ওয়াই-ফাই সংস্পর্শে পুরুষের বন্ধ্যত্ব, গর্ভপাত বা শিশুর বিকাশে ক্ষতি হয় বলে নিশ্চিতভাবে দাবি করা যায় না।
প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। শুধু ওয়াই-ফাই রাউটার চালু থাকার কারণে গর্ভবতী নারী বা শিশুদের বিশেষ স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
ওয়াই-ফাই কি শরীরের কোষের ক্ষতি করে?
রেডিওফ্রিকোয়েন্সি তরঙ্গের সাথে শরীরের মিথস্ক্রিয়ার একটি পরিচিত প্রভাব হলো আমাদের শরীরের টিস্যুতে তাপ তৈরি হওয়া। তবে সাধারণ ওয়াই-ফাই ব্যবহারে শরীরে যে মাত্রার শক্তি শোষিত হয়, তা খুব কম এবং সাধারণ পরিস্থিতিতে শরীরের তাপমাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটানোর মতো নয়।
ওয়াই-ফাইয়ের কারণে শরীরের কোষ নষ্ট হয় বা দীর্ঘ সময় রাউটার চালু থাকলেই শরীরে ক্ষতি জমতে থাকে, এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। মোবাইল ফোন, ওয়াই-ফাই রাউটার ও অন্যান্য বেতার যন্ত্র থেকে একই ধরনের বিস্তৃত শ্রেণির তরঙ্গ নির্গত হলেও সব যন্ত্রের শক্তি, ব্যবহারের ধরন ও শরীর থেকে দূরত্ব এক নয়। তাই একটি যন্ত্র নিয়ে করা গবেষণার ফল অন্য যন্ত্রের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা ঠিক নয়।
রাতে ওয়াই-ফাই বন্ধ রাখলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়
রাতে রাউটার বন্ধ রাখার একটি বাস্তব সুবিধা হলো বিদ্যুতের ব্যবহার কিছুটা কমানো। রাউটার চালু থাকলে বিদ্যুৎ খরচ হয়, যদিও সাধারণত এই খরচ তুলনামূলক কম।
কতটা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, তা রাউটারের ক্ষমতা, বিদ্যুৎ ব্যবহারের হার এবং প্রতিদিন কত ঘণ্টা বন্ধ রাখা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে। তাই সব রাউটারের ক্ষেত্রে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের হিসাব দেওয়া সম্ভব নয়।
রাউটারের গায়ে বা নির্দেশিকায় উল্লেখ করা বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য দেখে আনুমানিক হিসাব করা যায়। তবে রাউটার বন্ধ থাকলে এর সঙ্গে যুক্ত স্মার্ট যন্ত্র, নিরাপত্তা ক্যামেরা বা অন্য কোনো যন্ত্রের ইন্টারনেট সংযোগও বিচ্ছিন্ন হতে পারে। তাই বন্ধ করার আগে প্রয়োজনীয় সংযোগগুলোর বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
রাতে ওয়াই-ফাই বন্ধ রাখবেন কীভাবে?
রাতে ইন্টারনেটের প্রয়োজন না থাকলে কয়েকটি সহজ উপায়ে রাউটার বন্ধ রাখতে পারেন।
রাউটারের পাওয়ার বাটন ব্যবহার করুন: আপনার রাউটারে পাওয়ার বাটন থাকলে সেটি ব্যবহার করে বন্ধ করতে পারেন।
রাউটারের সময় নির্ধারণের সুবিধা দেখুন: কিছু রাউটারে নির্দিষ্ট সময়ে ওয়াই-ফাই চালু ও বন্ধ রাখার ব্যবস্থা থাকে। নির্দেশিকা দেখে সেটি চালু করা যায়।
প্রয়োজনে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন: রাউটার বন্ধ করার জন্য প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। তবে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা যন্ত্র বা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় সংযোগ এতে বন্ধ হয়ে যাবে কি না, তা আগে যাচাই করুন।
রাউটার কোথায় রাখছেন, খেয়াল করুন: রাউটার এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে বাতাস চলাচল করতে পারে এবং যন্ত্রটি অতিরিক্ত গরম না হয়। নির্মাতার নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করাই ভালো।
তাহলে কি প্রতি রাতে ওয়াই-ফাই বন্ধ করা উচিত?
স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সবারই রাতে ওয়াই-ফাই বন্ধ করা বাধ্যতামূলক, এমন কোনো প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা নেই। তবে রাতে ইন্টারনেটের প্রয়োজন না থাকলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য রাউটার বন্ধ রাখতে পারেন। এতে বেতার সংকেতের সংস্পর্শও কমবে।
অন্যদিকে, ইন্টারনেটের সাথে নিরাপত্তা ক্যামেরা, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা কিংবা অন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র যুক্ত থাকলে রাউটার বন্ধ করার আগে সেগুলোর কথা বিবেচনা করুন।
ঘুমের সমস্যা থাকলে শুধু ওয়াই-ফাইকে দায়ী না করে ঘুমের সময়সূচি, রাতে মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস, ক্যাফেইন গ্রহণ এবং শোবার ঘরের পরিবেশের দিকেও নজর দিন। দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
রাতে ওয়াই-ফাই বন্ধ রাখা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। এতে বিদ্যুৎ কিছুটা সাশ্রয় হতে পারে এবং বেতার সংকেতের সংস্পর্শও কমে। কিন্তু ওয়াই-ফাই চালু থাকলেই ক্যানসার, বন্ধ্যত্ব বা ঘুমের সমস্যা হয়, এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
তাই আতঙ্কিত না হয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিন। প্রয়োজন না থাকলে রাউটার বন্ধ রাখতে পারেন, আবার প্রয়োজনীয় সংযোগ সচল রাখার জন্য চালুও রাখতে পারেন। সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত ঘুম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


