যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর বিভাজন দেখা দিয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইয়ের আপত্তি কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে আরও উৎসাহিত করেছে, যারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের ছাড়ের ঘোর বিরোধী।
চুক্তিটি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে পাকিস্তান, কাতারসহ কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত হয়। তবে এই সমঝোতা স্মারক ইরানের ভেতরে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবির এটিকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছে।
সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানান, নীতিগতভাবে তার ভিন্ন মত ছিল, তবে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি শর্তসাপেক্ষে চুক্তিতে অনুমোদন দেন। শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত দাবি তুললে তা গ্রহণ করা হবে না এবং ভবিষ্যৎ আলোচনা কোনোভাবেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
ইরানের রাষ্ট্র-সমর্থিত গণমাধ্যম জানায়, নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত তিন-চতুর্থাংশ সদস্যের অনুমোদনের শর্তও ছিল, যা প্রায় নিশ্চিতভাবে পূরণ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিষদ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি “পূর্ণ অবিশ্বাস” বজায় রেখে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে এবং চুক্তি লঙ্ঘন হলে প্রতিশোধের পরিকল্পনাও প্রস্তুত থাকবে।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এই সমঝোতাকে “ঐতিহাসিক দলিল” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এটি এমন একটি বার্তা যা দেখায়—ইরান কোনো চাপ বা হুমকির বিনিময়ে নিজেদের মর্যাদা ও স্বাধীনতা বিসর্জন দেবে না।
সংসদীয় স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ চুক্তিকে “কঠিন ও দীর্ঘ পথের সূচনা” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি আলোচনার সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেন এবং বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া জরুরি।
তবে কট্টরপন্থী শিবির এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করছে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া উচিত নয় এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে তারা সংসদ পুরোপুরি খোলার দাবি জানিয়েছে, যাতে চুক্তির বিরোধিতা আরও জোরদার করা যায়।
রাষ্ট্র-সমর্থিত সমাবেশ ও ধর্মীয় বক্তৃতায়ও চুক্তির বিরোধিতা প্রকাশ পেয়েছে। কিছু কট্টরপন্থী নেতা প্রেসিডেন্ট ও মধ্যপন্থী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন, যা রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এসব উগ্র মন্তব্যের সমালোচনা করে বিভেদ সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়েছে এবং কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
দেশটির বিভিন্ন সংবাদপত্রও এই চুক্তি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। কট্টরপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও শর্তসাপেক্ষ সমর্থনের বিষয় হিসেবে দেখলেও সংস্কারপন্থী গণমাধ্যম এটিকে “বিজয় দলিল” হিসেবে অভিহিত করেছে, যা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা


