ইমাম গাজ্জালি- পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক। শেখ সাদি- একজন মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ ফার্সি কবি, যিনি কথার জাদুকর হিসেবে পরিচিত। আর ইবনে খালদুন- আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও অর্থনীতির অন্যতম পথিকৃৎ। তাদের শিক্ষাজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসার ইতিহাস।
শেখ সাদি পড়েছেন বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্রাসায়, আর সেখানে শিক্ষকতা করেছেন ইমাম গাজ্জালি। ইবনে খালদুনের শিক্ষা ও কর্মজীবন দেখায়, মাদ্রাসায় শিক্ষিত একজন মানুষ ইতিহাস, সমাজচিন্তা, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
অথচ আজ বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কেন তাদের কর্মক্ষেত্রের সুযোগ এত সীমিত? কেন তাদের কর্মকাণ্ড প্রায় বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে? মাদ্রাসা কি সব সময়ই শুধু ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠান ছিল? নাকি ইতিহাসের কোনো এক বাঁকে পুরোপুরি বদলে গেছে এর চরিত্র?
একাদশ শতকে সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রধান উজির নিজামুল মুলক বাগদাদে নিজামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তার লক্ষ্য ছিল দক্ষ সুন্নি আলেম তৈরির পাশাপাশি সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটাতে যোগ্য কর্মকর্তা গড়ে তোলা। রাষ্ট্র পরিচালনা, ন্যায়বিচার ও প্রশাসন নিয়ে তার লেখা সিয়াসতনামা ধর্মীয় জ্ঞান ও শাসনব্যবস্থার সংযোগ তুলে ধরা একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। সে সময় মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে কোরআন, হাদিস, তাফসির ও ফিকহের পাশাপাশি গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ভাষাতত্ত্ব ও চিকিৎসাবিদ্যার মতো বিষয়ও পড়ানো হতো। তবে প্রতিষ্ঠান ও অঞ্চলভেদে পাঠ্যক্রমে পার্থক্য ছিল।
ভারতবর্ষে মুঘল আমলে মাদ্রাসা থেকে বিচারক, আইনজ্ঞ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা তৈরি হতেন। উসমানীয় সাম্রাজ্যে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ ফাতিহের উদ্যোগে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি গণিত, দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। চিকিৎসাশিক্ষার জন্য গড়ে ওঠে পৃথক প্রতিষ্ঠান।
বাংলার সোনারগাঁয়ও ছিল সমন্বিত শিক্ষার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। ত্রয়োদশ শতকে শেখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি যুক্তিবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, ভূগোল ও চিকিৎসার মতো বিষয় পড়ানো হতো বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, একসময় মাদ্রাসা শুধু ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিল না; সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরিতেও ভূমিকা রাখত।
তাহলে এই সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন হলো কীভাবে?
দক্ষিণ এশিয়ায় বড় পরিবর্তন আসে ঔপনিবেশিক শাসনামলে। গবেষক আলী রিয়াজের Madrassah Education in Pre-colonial and Colonial South Asia গবেষণায় উঠে এসেছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের নীতি দক্ষিণ এশিয়ার মাদ্রাসার কাঠামো, কার্যক্রম ও পাঠ্যক্রমে গভীর প্রভাব ফেলে। একই সময়ে প্রশাসন ও চাকরির ক্ষেত্রে ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব বাড়তে থাকে। ফলে ধর্মীয় শিক্ষা ও মূলধারার শিক্ষার মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। পাশাপাশি ওয়াক্ফভিত্তিক অর্থায়ন দুর্বল হয়ে পড়ায় বহু ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এমন পরিস্থিতিতে মাদ্রাসা শিক্ষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল ১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত দেওবন্দ মাদ্রাসা। তবে ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় গড়ে ওঠা এই ধারায় ধর্মীয় পাঠের ওপর বেশি গুরুত্ব এবং যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের মতো কিছু বিষয়ের ওপর তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Oxford Bibliographies-এ প্রকাশিত গবেষণাতেও দেওবন্দের পাঠ্যক্রমে এই পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে। অবশ্য সব মাদ্রাসা একই পথে চলেনি; সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধারায় সংস্কারও হয়েছে।
এর প্রভাব নিয়ে আজ বাংলাদেশের কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় বিতর্ক রয়েছে। উচ্চতর পর্যায়ে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সীমিত হলে শিক্ষার্থীদের পেশাগত বিকল্পও সংকুচিত হয়। অনেকের কর্মক্ষেত্র মূলত মসজিদে ইমামতি, মাদ্রাসায় শিক্ষকতা কিংবা ধর্মীয় আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে।
পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের খাবার ও আবাসন, শিক্ষকদের কম বেতন ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং জবাবদিহির ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আবাসিক পরিবেশে কার্যকর তদারকি না থাকলে শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞানচর্চার দৃষ্টান্ত রয়েছে ইন্দোনেশিয়া ও মিসরেও। ইন্দোনেশিয়ার দারুসসালাম গন্তর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি মূল্যবোধের সাথে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তি ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ও ধর্মীয় শিক্ষার গণ্ডি ছাড়িয়ে চিকিৎসা, প্রকৌশল, বিজ্ঞান, কৃষি ও ব্যবসায় শিক্ষার বিস্তৃত পরিসর তৈরি করেছে।
এই দৃষ্টান্তগুলো দেখায়, ধর্মীয় শিক্ষার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও আধুনিক জ্ঞান ও পেশাগত শিক্ষার সাথে সংযোগ তৈরি করা সম্ভব। বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও এমন পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে পাঠ্যক্রমের সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। প্রচলিত ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা এবং পরিবর্তনে অনীহাও সংস্কারের পথে বাধা হয়ে উঠতে পারে।
অতীত আর বর্তমানের তুলনাটি তাই স্পষ্ট- একসময় মাদ্রাসা থেকে ধর্মীয় পণ্ডিতদের পাশাপাশি কবি, বিচারক ও প্রশাসক তৈরির পথও খোলা ছিল। অথচ আজ মাদ্রাসা শিক্ষা, বিশেষ করে কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় সেই বহুমুখী সুযোগের অনুপস্থিতি গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাহলে কি ধর্মীয় শিক্ষার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নিজামুল মুলকের সেই সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা, যে ব্যবস্থা একসময় গড়ে তুলেছিল ইমাম গাজ্জালি ও শেখ সাদির মতো মনীষীদের?

