...|...|...

জাতীয়

বছরের এই সময়েই তিস্তার ওপর বাঁধ কেন খুলে দেয় ভারত?

টাইমস টুডে ডেস্ক
আপডেট: ১৬ ঘণ্টা আগে
বছরের এই সময়েই তিস্তার ওপর বাঁধ কেন খুলে দেয় ভারত?

ছবি : সংগৃহীত

উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢল সামাল দিতে বাংলাদেশে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেটের সবগুলোই খুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে তিস্তাসহ অন্যান্য নদীর পানি বেড়ে বন্যার শঙ্কা তৈরি হয়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে।

প্রতি বর্ষায় ভারতের অংশে তিস্তা নদীর ওপর বাঁধ খুলে দেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশও তিস্তা ব্যারাজের গেট খুলতে বাধ্য হয়। ফলে নদনদীর পানি হঠাৎ করেই বেড়ে বাংলাদেশে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এবারও ব্যারাজের সব গেট খুলে দেওয়ার পর বাংলাদেশের নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার নদ-নদীর পানি বেড়েছে।

প্রতিবছর এই সময়, বিশেষ করে জুন-জুলাই মাসের দিকে, বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা বন্যার কবলে পড়ে, যার মূল কারণ হিসেবে বৃষ্টি ও উজান থেকে হঠাৎ করেই নেমে আসা পানির ঢলের কথা বলা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের যে মাত্রায় বৃষ্টি হয়, তাতে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হওয়ার শঙ্কা কম। কিন্তু উজানের দেশ ভারতের সঙ্গে থাকা আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোতে তৈরি করা বাঁধ খুলে দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে প্রতিবছরই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ অংশে নদীর নাব্য কমে যাওয়া বা নদী দখল হওয়াও বন্যার পেছনে ভূমিকা রাখে বলেও তারা জানান।

নদী গবেষক ড. মোহাম্মদ মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, উজান থেকে আসা পানি নিয়ে সংকট কাটাতে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন এবং বন্যা পূর্বাভাসসহ নানা তথ্য লেনদেনের বিষয়ে যৌথ নদী কমিশনের তৎপরতা বাড়াতে হবে। একটা যৌথ নদী কমিশন আছে শুনি, কিন্তু তার কোনো কার্যক্রম তো দেখি না। নেপাল, ভারত, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ এই চারটা দেশের মধ্যে নদী ইস্যুতে একটা সমঝোতা থাকতে হবে।

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, তারা (ভারত) আমাদের আশ্বস্ত করেছে যে, পানি ছেড়ে দিয়ে আমাদের এলাকাকে তারা বন্যায় প্রভাবিত করবে না। আমাদের যৌথ নদী কমিশনের টিম এবং মন্ত্রণালয়ও তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।

আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, আমাদের দেশের যে বন্যাগুলো হয় সেটি মূলত আপার স্ট্রিম অর্থাৎ উপরের দিকে ভারতের যে রাজ্যগুলো আছে সেখানকার পানির প্রভাবে। আমাদের ভূখণ্ডের বৃষ্টি থেকে যদি হয়, সেটিতে খুব দ্রুতই পানি নেমে যায়।

বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বা এফএফডব্লিউসি এর নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, আগামী তিন দিনে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কম থাকায় নদ-নদীর পানি স্থিতিশীল থাকতে পারে। তবে এরপর থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে, যার ফলে বাংলাদেশ এবং উজানের দেশে নদীর পানি বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক যে তথ্য ভারত সরবরাহ করেছে তাতে দেশটির গজলডোবা এবং ডৌমুহুনি পয়েন্টে নদীর পানি আপাতত স্থিতিশীল থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া আগামী তিনদিন ভারতের তিস্তা নদী সংলগ্ন অংশে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশের ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত বা অভিন্ন নদী রয়েছে, যার মধ্যে ৫৪টি ভারত এবং তিনটি মিয়ানমারের সাথে যৌথভাবে প্রবাহিত। ফলে উজানের দেশগুলোর আবহাওয়া তথা বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উজানের দেশ হওয়ায় ভারত, মিয়ানমার কিংবা নেপালের নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি পেলে সেটি ভাটিতে থাকা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ে।

সম্প্রতি উজানে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তা অববাহিকায় ভারতের গজলডোবা বাঁধ খুলে দেওয়া হয়েছে। এই পানির চাপ সামলাতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেটও খুলে দিয়েছে বাংলাদেশ। এতে করে তিস্তা নদীর পাশাপাশি দেশের উত্তর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বেশিরভাগ নদীর পানি বাড়ছে এবং কোনো কোনো নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, তিস্তা নদীর ওপর ভারতীয় অংশের বাঁধের দুয়েকটি গেট বছরজুড়েই খোলা থাকে। তবে কোনো চুক্তি না থাকায় তারা তাদের ইচ্ছামতো পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু বর্ষার শুরুতে পানির চাপ বাড়লে তারা সবগুলো গেট খুলে দেয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নদী গবেষক ড. মোহাম্মদ মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ভারতের সঙ্গে থাকা আন্তঃসীমান্ত নদীর উজানে ড্যাম বা বাঁধ নির্মাণই বাংলাদেশের উত্তর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে বন্যার কারণ। এ ছাড়া বাংলাদেশের নদীগুলোর গভীরতা কমে যাওয়ায় পানি ধারণ ক্ষমতাও কমেছে। যখন আপস্ট্রিমে (উজানে) বৃষ্টি হয় তখন তো আর পানি ধারণ করে রাখতে পারে না, বাঁধ খুলে দেয়। যখন উপর থেকে পানি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে তখন বন্যা হচ্ছে। আবার যখন পানি থাকে না, তখন আমাদের নদীগুলো ভরাট হচ্ছে, দখল হচ্ছে।

একদিকে উজানের দেশগুলো বাঁধ নির্মাণ করে পানি আটকে রাখায় শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। আবার বৃষ্টির মৌসুমে বাঁধ খুলে দিচ্ছে যার ফলে হঠাৎ বন্যা দেখা দিচ্ছে। অতিবৃষ্টির কারণে যখন অতিরিক্ত পানির চাপ তৈরি হয়, তখনই নিজেদের বন্যা পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে বাঁধের গেট খুলে দেয় উজানের দেশগুলো।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের উজানে থাকা ভারতও বৃষ্টির সময় বা বন্যা পরিস্থিতি হলে বাঁধ খুলে দেয়; আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট কমাতে তা বন্ধ রাখে। ফলে বর্ষা মৌসুমে আকস্মিক বন্যায় ভাসে বাংলাদেশ, আবার শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় এবং সেচের পানি সংকটসহ স্থানীয় জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।

বন্যা পূর্বাভাস এবং নদীর বাঁধ খুলে দেওয়াসহ নানা তথ্য সময়মতো দেওয়া হয় না বলে বাংলাদেশের অভিযোগ থাকলেও তা অস্বীকার করে আসছে ভারত।

বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলছেন, নিয়ম অনুযায়ী বছরের মে মাস থেকে উজানের ১৪টি পয়েন্টের তথ্য বাংলাদেশের সঙ্গে লেনদেন করে ভারত।

যৌথ নদী কমিশন বাংলাদেশের নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী শহীদুর রহমান বলেন, ভারতের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। আমরা ভারতের কাছে আরও বেশি তথ্য চাচ্ছি। কিন্তু আমাদের যে প্রত্যাশা সে অনুযায়ী বিপরীত পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, নদীর পানি বণ্টন ও তথ্য লেনদেন ইস্যুতে সহায়তা বাড়াতে ভারতে সঙ্গে আলোচনা চলছে। বিগত দিনে যেভাবে তারা বাঁধের গেটগুলো খুলে দিত, এই বিষয়গুলো আমরা এখন টাইম টু টাইম মনিটর করছি। তাদের সঙ্গেও আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।

তথ্যসূত্র- বিবিসি বাংলা