...|...|...

অর্থনীতি

দাম বাড়িয়েও স্বস্তি নেই, ১৮৩৭ টাকার এলপিজি বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজারে

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১০:০৫ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:০৫
Shares
দাম বাড়িয়েও স্বস্তি নেই, ১৮৩৭ টাকার এলপিজি বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজারে

১৮৩৭ টাকার এলপিজি বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজারে। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকট ও বাড়তি দাম নিয়ে অস্থিরতা কাটেনি। সরকার নির্ধারিত দাম বাড়ানোর পরও বাজারে নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। তবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই দামে সিলিন্ডার কিনতে পারছেন না গ্রাহকেরা। সরবরাহের ঘাটতির অভিযোগও রয়েছে।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলপিজির সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আমদানিকারক ও অপারেটর কোম্পানি থেকে শুরু করে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা বাজারের বিভিন্ন স্তরে দামের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ গ্রাহকেরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার এক গ্রাহক গত ২ অক্টোবর ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ৫০০ টাকায়। এর মধ্যে ৫০ টাকা ছিল সরবরাহ খরচ। ওই সময় সিলিন্ডারটির নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।

হাতিরপুলের ওই বিক্রেতা বেশি দামে বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তার দাবি, সরবরাহ সংকটের কারণে সিলিন্ডার কিনতে খরচ বেড়েছে। সর্বশেষ কেনা গ্যাসের প্রতিটি সিলিন্ডারে তার খরচ পড়েছে ২ হাজার টাকা। সেটি তিনি ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করছেন।

মিরপুরেও একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন এক দোকানি। সেখানে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম চাওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। মুন্সীগঞ্জেও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

অপারেটররাও নিচ্ছেন বাড়তি দাম

বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ডিলারদের ১২ কেজির সিলিন্ডার কেনার কথা ১ হাজার ৭৪২ টাকায়। ডিলারদের মুনাফা ৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফা ৪০ টাকা ধরে গ্রাহক পর্যায়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।

কিন্তু ডিলারদের অভিযোগ, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে তারা চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না। মুন্সীগঞ্জের এক ডিলার জানান, সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখের পর তিনি আর গ্যাস পাননি। নতুন চালান পেলে প্রতি সিলিন্ডারে তার খরচ পড়বে প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা।

গ্রিন এলপিজির এক ডিলার মোজাম্মেলের অভিযোগ, ১৮ সেপ্টেম্বরের পর তার কাছে গ্যাস সরবরাহ করা হয়নি। নতুন দাম নির্ধারণের পর অপারেটর কোম্পানি তাকে প্রতি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৯০ টাকা জানিয়েছে, যদিও নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী তার ১ হাজার ৭৪২ টাকায় সিলিন্ডারটি পাওয়ার কথা।

এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতিও অপারেটর পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ করেছে। সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান বলেন, অপারেটরদের বাড়তি দাম ও পরিবহন খরচের কারণে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বেড়েছে। এ অবস্থায় নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে অনেক ডিলার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে দাবি করেন তিনি।

আমদানি হলেও সংকট কেন

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এলপিজির ৯৮ শতাংশের বেশি আমদানি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। লাইসেন্সধারী কোম্পানির সংখ্যা ৩২ থেকে ৩৩ হলেও গ্যাস আমদানি করছে ১০ থেকে ১২টি কোম্পানি।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন। আমদানি কাছাকাছি পরিমাণে হলেও বাজারে সংকট কেন তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কিছু ব্যবসায়ীর অভিযোগ, অপারেটর পর্যায়ে সরবরাহ কম থাকায় ডিলাররা প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, আমদানিকারক ও অপারেটরদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ এবং সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যার কারণে ব্যয় বেড়েছে।

গ্রিন এলপিজির মহাব্যবস্থাপক আহসান হাবিব হিরো জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান গত দুই বছর ধরে সরাসরি এলপিজি আমদানি করছে না। অন্য অপারেটরদের কাছ থেকে গ্যাস কিনে বোতলজাত করে সরবরাহ করতে হয়। কিন্তু তারাও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, আমদানির কোটা ও অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতা কমানো প্রয়োজন। তার দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম ও সংশ্লিষ্ট খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমদানির ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।

নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

এলপিজির নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছে। জেলা প্রশাসকেরা ডিলারদের সাথে আলোচনা করছেন এবং কোথাও কোথাও অভিযান চালানো হচ্ছে।

বিইআরসি জানিয়েছে, আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে সংকটের কারণ খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।

তবে নির্ধারিত দাম ঘোষণা করেও বাজারে তা কার্যকর করতে না পারায় তদারকি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শেষ পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার সংকট ও বাড়তি দামের চাপ বহন করতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের।